আইয়ুব বাচ্চু: গিটারের সুরে বেঁচে থাকা এক কিংবদন্তি

প্রান্তডেস্ক:বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু শিল্পীর পরিচয় বহন করে না, হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতীক। আইয়ুব বাচ্চু তেমনই এক নাম। হাতে গিটার, কণ্ঠে আবেগ আর সুরে এক অদম্য শক্তি-এই তিনের সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা সংগীতভুবন। তাঁর গান যেমন প্রেমিকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি বিরহ, একাকিত্ব আর জীবনের কঠিন বাস্তবতাকেও দিয়েছে সুরের ভাষা।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্মগ্ৰহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। কৈশোর থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। গিটার হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। সত্তরের দশকের শেষদিকে ব্যান্ডসংগীতের সঙ্গে তাঁর পেশাদার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ‘সোলস’-এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে।
বিশেষ করে ‘সেই তুমি’ গানটি যেন বাংলা ব্যান্ডসংগীতের এক চিরন্তন বিরহের প্রতিচ্ছবি। সম্পর্কের দূরত্ব, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর না বলা কথার যে আবেগ তিনি গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, তা আজও শ্রোতাকে স্পর্শ করে। অন্যদিকে ‘চলো বদলে যাই’ হয়ে উঠেছে পরিবর্তন আর নতুন স্বপ্নের এক অনন্য সংগীতপ্রকাশ।
আইয়ুব বাচ্চু শুধু গায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ গিটারিস্ট, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে ইলেকট্রিক গিটারের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর গিটার যেন অনেক সময় তাঁর কণ্ঠের মতোই কথা বলত। একটি দীর্ঘ গিটার সোলো দিয়েও তিনি এমন অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন, যা হয়তো অনেক কথাতেও বলা সম্ভব নয়।
মঞ্চ ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গাগুলোর একটি। হাজারো দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে গিটার হাতে গান গাওয়া ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম বড় প্রকাশ। দর্শকদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল সরাসরি ও প্রাণবন্ত। ফলে আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট মানেই ছিল এক অন্যরকম উন্মাদনা।
তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু ব্যান্ডসংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একক শিল্পী হিসেবেও তিনি অসংখ্য শ্রোতার হৃদয় জয় করেছেন। ‘কষ্ট’, ‘দুটি মন’, ‘ময়না’, ‘এক আকাশের তারা’সহ তাঁর একাধিক অ্যালবাম ও গান বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে ‘কষ্ট’ শব্দটি যেন তাঁর সংগীতের সঙ্গে এক ধরনের স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছিল।
আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনলে বোঝা যায়—তিনি শুধু গান গাইতেন না, গানকে অনুভব করতেন। প্রেমের গানেও ছিল বিষণ্নতার ছায়া, আবার বিষণ্নতার গানেও কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। তাঁর সংগীতে তাই একই সঙ্গে ছিল ভালোবাসা, অভিমান, বিচ্ছেদ, স্মৃতি এবং ফিরে পাওয়ার আকুলতা।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর চলে যাওয়া বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তৈরি করে এক বিশাল শূন্যতা। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিল্পী আরও বেশি করে মানুষের স্মৃতিতে ফিরে আসেন।আইয়ুব বাচ্চুও তেমনই একজন।চট্টগ্রামের সেই তরুণ, যার হাতে একদিন উঠেছিল গিটার, তিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম মুখ। তাঁর রূপালী গিটার আজ আর তাঁর হাতে নেই, কিন্তু সেই গিটারের সুর এখনো ভেসে আসে অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে।সময় বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে, শ্রোতার রুচিও বদলেছে। কিন্তু ‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’ কিংবা ‘রূপালী গিটার’-এর মতো গান এখনো নতুন প্রজন্মের কানে পৌঁছে যায়। কারণ কিছু গান কেবল শোনা যায় না—অনুভব করা যায়।আর কিছু শিল্পী কেবল একটি সময়ের নন।তাঁরা হয়ে ওঠেন সময়ের পর সময়ের।আইয়ুব বাচ্চু ঠিক তেমনই এক কিংবদন্তি-যিনি গিটারের তারে রেখে গেছেন নিজের হৃদয়ের স্পন্দন, আর তাঁর গান হয়ে আছে বাংলা সংগীতপ্রেমীদের ভালোবাসার এক অনন্ত ঠিকানা।

