প্রান্তডেস্ক:সিলেটে মহানগরীর রায়নগরে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে ‘ভাড়াটে খুনি’ দিয়ে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত দম্পতির সন্তান সেলিনা সুলতানার করা মামলায় এ অভিযোগ করা হয়। তবে এ ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার বাবুল মিয়ার নাম এজাহারে নেই। অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি করেন।
এজাহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, তার বাবা এম এ সাত্তার ১৯৯৭ সালে সিলেট পুলিশ লাইন্স লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরফপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি ইজারা নিয়ে সেখানে বসবাস করছিলেন। পরে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিজনেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ওই জমিসহ সমিতির আরও জমি তার প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল করে মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে তাদের উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়।
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে এম এ সাত্তার ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন।
এজাহারে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারির একটি ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। সেলিনার অভিযোগ, ওই দিন বিকালে সিরাজুল ইসলাম, আমিন হোসেনসহ কয়েকজন তাদের বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তারা চলে যান। পরে এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন সেলিনা।
এজাহারে আরও বলা হয়, সর্বশেষ গত ২৮ ও ৩০ জুলাই আদালত প্রাঙ্গণে এম এ সাত্তারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এসব বিরোধ ও হুমকির ধারাবাহিকতায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তিন জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সেলিনা।
হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র, জিডির কপি এবং জমিসংক্রান্ত দলিলপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার পর সেলিনা সুলতানা বলেন, ‘আমি আর আমার ভাই আসছি। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরে যেন আর কোনও মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনও মা-বাবার লাশ না ওঠে।’
গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন সেলিনা। তিনি বলেন, ‘কাজের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার মা মারা গেছেন। একটা বাচ্চা মেয়ে, সে খুব ভালো ছিল। মেয়েটার কাছে কোনও মোবাইল ছিল না। মেয়েটা আমাদের কাছে আমানত ছিল। কেইসটা ঘোরানোর জন্য মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে। এটা সত্য কোনও ঘটনা না।’
হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার বাবুল মিয়া একা এই ঘটনা ঘটাতে পারেন না দাবি করে সেলিনা বলেন, ‘তিনটি মার্ডার এই ছেলেটা করতে পারে না। এর পেছনে বড় কোনও হাত আছে।’
নিহত এম এ সাত্তারের ছেলে আরিফ ইফতেখার বলেন, ‘আমরা ওয়েট করি, দেখি রিমান্ডে নেওয়া হোক, তদন্ত হোক।’
উল্লেখ্য, বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে এম এ সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনার (২৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই দিন বিকালে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রংমিস্ত্রির কাজের সূত্রে গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের পরিচয় হয়েছিল। তবে নিহত দম্পতির পরিবারের দাবি, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও পূর্বের হুমকির ঘটনা।
মামলার বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির বলেন, ‘নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে নিহত আবদুস সাত্তারের বিরোধের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এখন এজাহারে করা অভিযোগ এবং পুলিশের হাতে থাকা তথ্য দুই দিক সামনে রেখেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’