ড. সুন্দরীমোহন দাস 🎯 অপরিচয় ও বিস্মৃতিতে বিলীন
সুদিন চট্টোপাধ্যায়::সদ্য প্রকাশিত একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে কলকাতার ন্যশনাল মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবস ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ, ১৯২১ সালের ১৪ এপ্রিল বলে ঘোষিত হয়েছে। এই দিনই অসহযোগ আন্দোলনের তহবিল থেকে ১৫ হাজার টাকা অনুদান নিয়ে ১১ নম্বর ওয়েলিংটন স্ট্রিটের ‘ফোর্ব’স ম্যানসন’-এ স্থাপিত হয়েছিল ন্যশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট। পরে ১৯৪৮-এ বউবাজারে ক্যালকাটা মেডিকেল স্কুলের সঙ্গে তা মিলে গিয়ে নাম হয় ন্যশনাল মেডিকেল কলেজ। ১৯৭৬ সালের ১১ জুন থেকে সেটি সরকারি মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয়। সংবাদে উল্লেখই নেই যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান, জাতীয় আন্দোলনের ফসল, দেশবাসীর আবেগ ও ভালোবাসার এই তীর্থপীঠে প্রথম থেকেই অধ্যক্ষের দায়ভার নিয়েছিলেন ত্যাগ ব্রতী দেশসেবক ড. সুন্দরীমোহন দাস। তিনিই তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন এই বিদ্যা কেন্দ্রকে। সুন্দরীমোহন একালের বাঙালির কাছে প্রায় অশ্রুত একটি নাম। তাঁর পরিচয়ও প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে কালের ধুলোয়। কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণের এক পাশে চরম উদাসীনতায় প্রায় পরিতক্ত্যের মতো বছরের দুটি দিন, জন্ম ও মৃত্যুদিনে মাল্যভূষিত তাঁর মর্মর মূর্তিটি অকৃতজ্ঞ বঙ্গবাসীর দিকে উপহাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এই কলেজেরই তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। দেশের মুক্তির সংগ্ৰামে, চিকিৎসা বিজ্ঞান পঠনপাঠনের ব্রতে, সামাজিক সংস্কারে কৃতসংকল্প, প্রগতিপন্থী, অগ্ৰণী এই হৃদয়বান মানুষটি ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেছেন। অথচ এই মানুষটি তাঁর ডাক্তারী পেশার সমস্ত দায়দায়িত্ব সামলে, সাহিত্য চর্চা করেছেন, জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, নারীমুক্তি ও বিধবাবিবাহে উৎসাহী হয়ে অংশ নিয়েছেন। দুই ব্রিটিশ ভারতের শ্রীহট্ট জেলার ডিগালি গ্রামে ১৮৫৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর তাঁর জন্ম। সিপাহি বিদ্রোহের ধুন্ধুমার কাণ্ড চলছে তখন। ভয়ে গ্ৰাম ছাড়ছে মানুষ। সুন্দরীমোহনের গর্ভবতী মা’ও নৌকায় ভেসেছিলেন। আর সেই জলের বুকে ভাসমান তরণীতে সময়ের অনেক আগে অপরিণত সুন্দরীমোহনের জন্ম হয়েছিল, শিশুটিকে তুলোর ঝুড়িতে রেখে তিলে তিলে বড়ো করা হয়। সাড়া জাগানো ঘটনা। পড়শীরা বললেন এ ছেলে ভবিষ্যতের বুকে আঁচড় কেটে যাবে। সুন্দরীমোহনের বাবা, স্বরূপচন্দ্র দাস ঢাকা কমিশনারেটের অধীন তৎকালীন শ্রীহট্ট কালেক্টরেটে দেওয়ানের কাজ করতেন। তাঁর পরিচিতি হয়, দেওয়ান স্বরূপ চাঁদ নামে। পরে পদোন্নতি হওয়ায় তিনি কালীঘাটের প্রধান দেওয়ান হয়ে কলকাতায় চলে যান। তখন সেখানে চলছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র সুন্দরীমোহন প্রবেশিকা পরীক্ষা পর্যন্ত সিলেট সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি হয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং এম বি পরীক্ষা খুব কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ওঁর পড়াশোনায় পিতা স্বরূপচন্দ্রের পকেট থেকে একটি কানা কড়িও খরচ হয়নি, ছাত্রবৃত্তির টাকায় তিনি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়েছেন। কলকাতায় পড়াশোনার সময়েই তাঁর মনে স্বদেশপ্রীতি ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। তিনি হিন্দু মেলার সংস্পর্শে আসেন, লাঠি খেলা, কুস্তি, নানা রকম শারীরিক কসরতে তিনি বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন। দ্বিতীয়ত তাঁর সিলেটি বন্ধু বাগ্মী বিপিনচন্দ্র পাল এবং আনন্দচন্দ্র মিত্রের সহযোগিতায় ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় শিবনাথ শাস্ত্রীর নিকট সান্নিধ্যে আসেন, জাতপাতে ছিন্নভিন্ন হিন্দু ধর্ম ছেড়ে ‘ব্রাহ্ম’ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমাজ সংস্কার, নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি কাজেও আত্মনিয়োগ করে তাঁর স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দেন। পরবর্তী কালে নিজেও বিধবা রমণী হেমাঙ্গিনী দেবীকে বিয়ে করেন। দেশব্রত, বিদেশের পণ্য বর্জন, সমাজ, শিক্ষা ও নারী অগ্রগতির কাজে দায়িত্ব গ্রহণ সহ, কৃচ্ছসাধনের মধ্যে সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের শপথ নিয়ে সুন্দরীমোহন কলকাতায় তাঁর শিক্ষার্থী জীবন শেষ করে দেশঘর সিলেটের ডিগালি গ্ৰামের উদ্দেশ্যে পা বাড়ান। তিন সিলেটের জল, মাটি, হাওয়া সুন্দরীমোহনের অন্তরের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল। তাই পাশ করার পরই সিলেট জেলা বোর্ডে ডাক্তারের চাকরি নিয়ে তিনি হবিগঞ্জে চলে আসেন। তাঁর মনে হয়েছিল এখানকার মানুষের তাঁকে দরকার আছে। সারা দেশেই পাশ করা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল নগণ্য, হবিগঞ্জের তো কথাই নেই। মনপ্রাণ দিয়ে চিকিৎসা ও সেবাব্রতে তিনি নিজেকে ছড়িয়ে দেন। তার সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তোলা এবং বিধবা বিবাহে উৎসাহ দেওয়ার অপরাধে তিনি পৈতৃক ভিটেচ্যুত হন। তথাপি বিশ্বাস এবং অবস্থান থেকে তিনি এক চুলও নড়েননি। কুসংস্কার%

