১৯৫৮ সালের অক্টোবর : সামরিক শাসনের কবলে পাকিস্তান

সামরিক শাসন জারির পর মির্জার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করা। এর মধ্যে ছিল এক নির্মম পরিহাস। আইয়ুবকে এত ক্ষমতাশালী পদে বসিয়ে মির্জা যে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই বিসর্জন দিচ্ছেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি। মির্জা ও আইয়ুব দুজনই ছিলেন ধূর্ত প্রকৃতির। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বেশি কৌশলী আইয়ুবই জয়ী হন।
এর আগে মির্জা একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। সেই মন্ত্রিসভায় জায়গা পান লারকানার বিদেশে শিক্ষিত এক তরুণ আইনজীবী, জুলফিকার আলী ভুট্টো। মির্জার ছেলে হুমায়ুন মির্জার বন্ধু ভুট্টো মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে তিনি প্রেসিডেন্টকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি চিঠি লিখে পাঠান। চিঠিতে তিনি এমন কথাও বলেছিলেন, যা বিস্ময় জাগানোর মতো। তাঁর মতে, ইতিহাসে মির্জাকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চেয়েও মহান ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করা হবে।
সামরিক শাসন ঘোষণার পরের ২০ দিন আইয়ুব খান অধৈর্য হয়ে কাটান। মির্জার সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে তাঁকে যে অস্বস্তিতে থাকতে হচ্ছিল, তা স্পষ্ট ছিল। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর ভেতরে আইয়ুব ও তাঁর সহযোগী কর্মকর্তারা যে মির্জার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ছিলেন সম্পূর্ণ অজ্ঞ। জেনারেল বুরকি, কে এম শেখ, মুসা, ইয়াহিয়া খানসহ আইয়ুবের অনুগত কর্মকর্তারা মনে করতেন, একই রাষ্ট্রে দুই ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা থাকা সম্ভব নয়। প্রেসিডেন্ট মির্জাকে সরাতেই হবে।
২৭ অক্টোবর ওই কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে, যাঁদের মধ্যে ইয়াহিয়া খানও ছিলেন, করাচিতে মির্জার সরকারি বাসভবনে পাঠানো হয়। তখন করাচিই ছিল পাকিস্তানের রাজধানী। সেখানে তাঁকে বন্দুকের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। মির্জা ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদকে বিমানে করে কোয়েটায় পাঠানো হয়। নাহিদ এর আগে তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত একজন ইরানি নৌ-কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন। কয়েক দিন পর মির্জা ও নাহিদকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। মির্জাকে আর কখনো পাকিস্তানে ফিরতে দেওয়া হয়নি।
২৭ অক্টোবর থেকে আইয়ুব খানের হাতে চলে আসে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক—দুই পদেই অধিষ্ঠিত। তিনি একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যার অধিকাংশ সদস্য ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। তবে কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকেও রাখা হয়। তরুণ ভুট্টো দ্রুত নিজের অবস্থান পাল্টে আইয়ুবকে বোঝান যে তিনি তাঁর দলে থাকতে পেরে খুশি। ভবিষ্যতে ভুট্টোর রাজনীতিকে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রভাবিত করবে, এটি ছিল তার প্রাথমিক ইঙ্গিত।
এদিকে প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মুনিরের নেতৃত্বাধীন উচ্চ আদালত ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ বা ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগ করে সামরিক শাসন জারি ও আইয়ুবের ক্ষমতা দখলকে প্রশ্নবিদ্ধ আইনি বৈধতা দেয়। পরবর্তী বছরগুলোতে এই বিতর্কিত পদক্ষেপই উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তাদের পাকিস্তানের রাজনীতিতে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়।
বিচারপতি মুনির সেই একই ব্যক্তি, যাঁর নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মৌলভি তমিজউদ্দিন খানের আইনি চ্যালেঞ্জ খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল। সে সময়ও প্রয়োগ করা হয়েছিল ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’। চার বছর পর মুনির আবারও একই ধরনের ভূমিকা নেন। আইয়ুবের ক্ষমতা দখলকে তিনি ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অথচ আইয়ুবের ক্ষমতা দখল কোনোভাবেই ওই বিপ্লবগুলোর সমতুল্য ছিল না।
৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি ছিল পাকিস্তানের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে মির্জাকে শেষ পর্যন্ত একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপকের কাজ করতে হয়েছিল। তবু তিনি নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
অন্যদিকে, আইয়ুব খান পাকিস্তানকে নিজের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে তাঁর সরকার কুখ্যাত ইলেকটিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডিন্যান্স বা ইবিডিও জারি করে। এর লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। কোনো যুদ্ধে বীরত্ব দেখানো ছাড়াই নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা এই জেনারেল প্রথম চার বছর সামরিক আইনের অধীনে পাকিস্তান শাসন করেন।
১৯৬২ সালে তাঁর সরকার নতুন সংবিধান প্রণয়ন করার পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। তবে ওই সংবিধানের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা। সর্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে মাত্র ৮০ হাজার সদস্যের একটি নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়।
সামরিক আইন প্রত্যাহার হলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনা হয়নি। ক্ষমতায় থাকা পুরো দশ বছরই আইয়ুব ছিলেন একজন স্বৈরশাসক। পাকিস্তানে একটি জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুটি প্রাদেশিক পরিষদ গঠন করা হয়। এসব পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন ‘বেসিক ডেমোক্র্যাটস’ নামে পরিচিত ওই ৮০ হাজার ব্যক্তি। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা নিজের হাতে রাখেন। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল আজম খান ও গোলাম ফারুকের মতো ব্যক্তিদের নিয়োগ ও অপসারণ তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আবদুল মোনেম খান নামের এক স্বল্পপরিচিত বাঙালি আইনজীবী ও আইয়ুবের অনুগত ব্যক্তি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রভাবশালী কালাবাগের নবাব মালিক আমির মোহাম্মদ খান বেশ কয়েক বছর গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অবসর নেওয়া জেনারেল মোহাম্মদ মুসা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তী সময়ে নবাবকে তাঁর এক ছেলে হত্যা করেন। ঘটনাটি পারিবারিক বিরোধের জের ধরে ঘটেছে বলে প্রচার করা হয়েছিল।
বেসামরিক রাজনীতিকের পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে আইয়ুব খান মুসলিম লীগকে সফলভাবে বিভক্ত করেন। দলটির একটি অংশ নিয়ে তিনি গঠন করেন কনভেনশন মুসলিম লীগ।
ক্ষমতায় থাকার দশ বছরে আইয়ুব এমন একটি বেসামরিক-সামরিক ক্ষমতাকাঠামো গড়ে তোলেন, যা রাজনীতিকে দুর্বল করে এবং পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। সরকারি কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের একাংশের তোষামোদ ছিল বিব্রতকর পর্যায়ের। আইয়ুবের স্মৃতিকথা ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স বা ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ অন্যের হাতে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
১৯৬৩ সালে মোহাম্মদ আলী বগরার মৃত্যুর পর ভুট্টো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব ও ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে একটি অর্থহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের পরিণতিতে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে আইয়ুব খানকে তাসখন্দ ঘোষণা প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষর করতে হয়।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভুট্টো ওই ঘোষণায় একটি ‘গোপন ধারা’ রয়েছে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সরকার থেকে বেরিয়ে আসেন এবং নিজের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক আইয়ুবের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করার উদ্যোগ নেন।
পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খান ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, সেই মামলাই শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের পতনের পথ তৈরি করে।
আইয়ুবের অনুরাগীরা তাঁকে এশিয়ার চার্লস দ্য গলের সমতুল্য নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করতেন। তাঁর শাসনামলকে তাঁরা ‘উন্নয়নের দশক’ বলে আখ্যা দিতেন। কিন্তু এই উদ্যাপনের সময়েই পাকিস্তানের দুই অংশে তাঁর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাঁধছিল।
১৯৬৯ সালের শুরুতে আইয়ুব গভীর সংকটে পড়েন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে তিনি বাধ্য হন। নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান। এর আগে খান আবদুল ওয়ালি খান ও ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও মুক্তি দিতে হয়।
১৯৬৯ সালের মার্চে আইয়ুব খানের ক্ষমতা ছাড়ার ঘটনাটিও ছিল গণতন্ত্রবিরোধী পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা। ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের স্পিকার আবদুল জব্বার খানের হাতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও আইয়ুব তা করেননি। তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে। ইয়াহিয়া সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানে নতুন করে সামরিক আইন জারি করেন।
ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খান পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছিলেন, তা দেশটির ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে আইয়ুব মারা যান বিস্মৃত ও অনেকটা উপেক্ষিত অবস্থায়। ইস্কান্দার মির্জা ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে লন্ডনে মারা যান। ইয়াহিয়া খান তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে সমাহিত করার অনুমতি দেননি। ফলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে তেহরানে দাফন করেন।
পরিশিষ্ট
১৯৫৮ সালের অক্টোবরের পর পাকিস্তান আরো তিন দফা সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে গেছে—ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক ও পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে। ক্ষমতা দখলের দুই বছর পর জেনারেল আইয়ুব খান নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেছিলেন। আর ইসলামাবাদের বর্তমান ক্ষমতাধর ব্যক্তি আসিম মুনিরকে জেনারেল পদ থেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেছে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট বেসামরিক সরকার।
* লেখক : রাজনীতি, কূটনীতি ও ইতিহাস বিষয়ের লেখক

