একুশ আগস্ট মামলার ২২ বছর

প্রান্তডেস্ক২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হন তিন শতাধিক নেতাকর্মী।
ওই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মতিঝিল থানায় দুটি মামলা করে। এজাহারে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ওই হামলা চালানো হয়। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড আনা হয় পাকিস্তান থেকে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ নিয়ে মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২। তবে আসামিদের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হুজি নেতা আবদুল হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ফলে এ মামলা থেকে তাদের নাম বাদ যায়। মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। রায় দেওয়ার সময় ৩১ জন কারাগারে ছিলেন।
দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা আসামিরা সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের করা আপিল মঞ্জুর করেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন খারিজ করে দেন। আদালতে যারা আপিল করেছেন, আর যারা করেননি, সবাইকে এ মামলা থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, এ মামলায় দুর্বল ও শোনা সাক্ষীর ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন বিচারিক আদালত। সাক্ষীরা ঘটনার বর্ণনা দিলেও, কে গ্রেনেড ছুড়েছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলেননি।
আসামিদের খালাস দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যেভাবে এ মামলায় পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’। যে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে এ মামলার বিচার শুরু হয়েছিল, সেই অভিযোগপত্র ছিল ‘অবৈধ’। হাইকোর্ট বলেন, ‘সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, এ মামলায় যেভাবে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা অবৈধ।’
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, মুফতি হান্নানের জবানবন্দির আলোকে মামলার যে দ্বিতীয় অভিযোগপত্র নেওয়া হয়েছে, সেটি ছিল বেআইনি। প্রথম অভিযোগপত্রটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ওই অভিযোগপত্রটিও মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে। যা তিনি পরে প্রত্যাহার করে নেন। তদন্ত কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া ২৫ সাক্ষীর কেউই বলেননি কে গ্রেনেড ছুড়েছে বা কেউ ছুড়তে দেখেছে কিনা। ফলে প্রকৃত খুনি কে, সেটির প্রমাণ নেই। তাই শুধু কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য আসামিকে সাজা দেওয়া যায় না।
২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল দেশের ইতিহাসে একটি জঘন্য ও মর্মান্তিক ঘটনা, যেখানে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আইভি রহমানও ছিলেন। নিহতদের আত্মার প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এই মামলাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো উচিত, যাতে সঠিক এবং দক্ষ তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে পুনরায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
হাইকোর্টের রায়ের এই অংশটি ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত বিচারে বাদ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গনমাধ্যমকে বলেন, ২১ আগস্টের মামলায় সবাইকে সর্বোচ্চ আদালত নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য রায়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তাহলে, এই অপরাধের বিচার তো হতাহতের পরিবার পেল না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির গনমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা পরিচালনা করলে এই পরিণতি হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যে যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে, সে তখন মামলা নিজের মতো করে চালাতে চায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে বিচার পাওয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পূবর্বর্তী সরকার এই মামলায় সবাইকে আসামি করে সাজা দিয়েছে, সেজন্য পরবর্তী সময় এসে আসল বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক।’(সৌজন্য:দৈনিকসমকাল)

