ইরাকের তেল বিষয়ক মন্ত্রী ব্লুমবার্গকে জানান, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো না হলে ওপেকে থাকা না থাকার বিষয়ে তাদের নতুন করে ভাবতে হবে। যুদ্ধে ইরাকের তেল উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল থেকে কমে এপ্রিল-মে মাসে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এখন তারা রেকর্ড দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের অনুমতি চায়। তারা দীর্ঘমেয়াদে ৭০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করতে চায় বলে জানায়। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশটির এই মুহূর্তে নগদ অর্থের তীব্র প্রয়োজন। তবে এই সংকটে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি রয়েছে ওপেকের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি সৌদি আরবের হাতে। ইরাক বা কুয়েতের মতো সৌদির হুট করে উৎপাদন বাড়ানোর তাড়া নেই। কারণ যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে তারা প্রায় ৬০ ভাগ ব্যবসা সচল রাখতে পেরেছিল, যা পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল ইরাক বা কুয়েতের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে সৌদি আরব বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন হুট করে বাড়ানোর ঘোর বিরোধী। কারণ বৈশ্বিক চাহিদা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হওয়ার আগে বাজারে তেলের বন্যা বয়ে দিলে তেলের দাম ও মুনাফা দুটিই তলানিতে ঠেকবে। এই কারণেই রাশিয়া ও অন্যান্য নন-ওপেক দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত ওপেক প্লাস জোট সম্প্রতি দৈনিক মাত্র ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক যদি উৎপাদন সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যায়, তবে সেই তেলের বড় কোনো ক্রেতা মিলবে না। যুদ্ধের সময় তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এবং সরবরাহের ঘাটতি থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদা ব্যাপক কমে যায়, যা এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপ এই বসন্তে ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ায় তেলের চাহিদা আগের জায়গায় আর কখনো নাও ফিরতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জরুরি তেলের মজুদ (রিজার্ভ) ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল কমে গেছে এবং তা পূরণ করা প্রয়োজন, তবে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেশগুলো ২০২৭ সালের আগে বড় কেনাকাটায় নাও যেতে পারে। যদি ওপেকের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ে, তবে আগামী বছর তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে তা ৫০ ডলারে নেমে আসতে পারে। আর পরিস্থিতি যদি আরও চরম আকার ধারণ করে, তবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান অন্য সদস্যদের ওপর চাপ তৈরি করতে নিজেদের উৎপাদনও বাড়িয়ে দিতে পারেন।
তেমনটি হলে তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৪০ ডলারের ঘরে নেমে আসবে। এমন এক পরিস্থিতি যা কেবল সৌদির মতো ধনী দেশের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব, বাকি ওপেক সদস্যদের জন্য যা হবে চরম বিপর্যয়। বৈশ্বিক তেলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ ঘাটতি থেকে এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেলের উদ্বৃত্তের দিকে যাওয়ার এক নির্মম উপহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববাজার।


