আজও রহস্যে ঘেরা তাড়াশের ‘বেহুলার বাড়ি’

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ::সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিনসাড়া গ্রামটি লোকগাথার অমর চরিত্র বেহুলা-লক্ষিন্দরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই গ্রামের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে বেহুলার সেই কিংবদন্তি ‘সোনার নৌকা’। আর তার পাশেই রয়েছে অলৌকিক এক ‘জীয়নকূপ’। এই দুই ঐতিহাসিক ও লোকজ নিদর্শন নিয়ে আজ অব্দি কাটেনি মানুষের কৌতূহল ও রহস্য।
জনশ্রুতি রয়েছে, সাপে কাটা পতি লক্ষিন্দরের মৃতদেহ ভেলায় নিয়ে যাওয়ার পথে বেহুলার নৌকাটি এখানকার একটি খাঁড়িতে (ছোট নদী বা নালা) ডুবে যায়। অন্য এক মতে, এখানেই লক্ষিন্দর ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর প্রাণ। বর্তমানে সেই স্থানে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি নৌকা আকৃতির উঁচু ঢিবি দেখা যায়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ডুবন্ত সোনার নৌকা’ নামে পরিচিত। এর পাশেই রয়েছে জীয়নকূপ। বলা হয়ে থাকে, পতিকে জীবিত করার জন্য এই কূপের পানি ব্যবহার করেছিলেন বেহুলা। বছরের পর বছর পার হলেও অলৌকিক এই কূপের পানি কখনো শুকায় না। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে রোগমুক্তি কিংবা মানত নিয়ে আসেন।
পরিচয় ও রূপকথার বাসর ঘর: ইতিহাস ও লোককথা অনুযায়ী, তাড়াশের বারুহাস ইউনিয়নের তৎকালীন নিচানী বাজারের (বর্তমান বিনসাড়া গ্রাম) বাছো বানিয়ার রূপসী কন্যা ছিলেন বেহুলা। তাঁর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় বগুড়ার চম্পকনগরের চাঁদ সওদাগরের ছোট ছেলে লক্ষিন্দরের। সাপের দংশন থেকে লক্ষিন্দরকে বাঁচাতে লোহার নিশ্ছিদ্র বাসর ঘর তৈরি করা হলেও সুতানলী সাপের হাত থেকে রক্ষা পাননি তিনি। এরপর স্বামীর প্রাণ ফেরাতে বেহুলার যে অসম সাহসী যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম সাক্ষী এই বিনসাড়া গ্রাম।
বটগাছের ছায়ায় প্রেমের স্মৃতি: জীয়নকূপ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন বটগাছ। প্রায় ৫৬০টি ঝুরি নিয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই গাছটির নিচে দাঁড়িয়েই নাকি বেহুলা-লক্ষিন্দরের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। বটগাছের মাঝে একটি শিব মন্দিরও রয়েছে। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী এখানে আসলেও পর্যাপ্ত পর্যটন সুবিধার অভাবে তাঁদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবি: বিনসাড়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা অমল কুমার (৭০) ও জতি রানী (৭৫) জানান, এই স্থানটি নিয়ে যেমন রয়েছে শ্রদ্ধা, তেমনই রয়েছে এক ধরনের অলৌকিক ভয়। একসময় এই ঢিবির ওপর কোদাল চালাতে বা মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল হতো বলে মানুষ এখনো জায়গাটিকে এড়িয়ে চলে।
তবে সঠিক সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি উদ্যোগে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করা হলে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস উঠে আসবে এবং লোক-ঐতিহ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি টিকে থাকবে।
প্রশাসনের আশ্বাস: তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “বেহুলার জীয়নকূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, যে খালপথ দিয়ে বেহুলার নৌযাত্রার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেই খালটি পুনঃখননের চিন্তাভাবনা চলছে। প্রত্নসম্পদগুলো তালিকাভুক্ত করে এখানে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।(সৌজন্যে:প্রতিদিনেরসংবাদ)

