সরকার বিচার বিভাগে কোনো খবরদারি করবে না: সাংবাদিকদের মুক্তি প্রসঙ্গে প্রেস সচিব

প্রান্তডেস্ক:অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেছেন, সরকার বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
তিনি এও বলেছেন, “বিচার বিভাগ তার মতো করে চলবে এবং যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা নিঃসন্দেহে আইনগতভাবে মোকাবেলা করে বেরিয়ে আসবেন।
“সরকার— বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না; কারও ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আমি এইটুকু পর্যন্ত বলতে পারি।”
যুক্তরাজ্য সফররত সালেহ শিবলী রোববার লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সেখানেই সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া হত্যা মামলা ও হয়রানির’ অভিযোগ রয়েছে। যদি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তবে তাদের বিচার করা হয় না কেন?
জবাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, “যারা যেভাবে আটক হয়েছেন, যারা যেভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন— এই সরকার ব্যক্তিগতভাবে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে বিচার বিভাগের উপরে কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না এবং বিচার বিভাগের উপরে কোনো খবরদারি করবে না।”
তিনি বলেন, “এ সরকারের আমলে একজন সাংবাদিককেও গ্রেপ্তার করা হয় নাই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে একজন সাংবাদিককেও গ্রেপ্তার করা হয় নাই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাসহ সব সাংবাদিকের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে গত ২১ মে লন্ডনে এক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এ দাবি তুলে ধরেন একদল ব্রিটিশ সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা। এর আগে কয়েক দফা এ দাবি জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।
সালেহ শিবলী বলেন, “এখন যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এখন যদি আপনারা গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেন যে–এদেরকে ছেড়ে দেন, তার মানে তো আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিক হিসেবে তো আপনি ইন্টারফেয়ার করতেছেন যে, ‘ঠিক আছে, আপনি বিচার বিভাগের সাথে কথা বলেন, এদেরকে ছেড়ে দেন’।
“…তার মানে এটা তো কেউ ইচ্ছে করলে প্রশ্নও করতে পারে। আমাকেও কয়দিন প্রশ্ন করেছে যে, তার মানে তো আপনারা চান যে প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগের উপরে ইন্টারফেয়ার করুক, একটু কথা বলুক।
“আমরা কেন এই কথা বলি না যে—যতজন সাংবাদিক আছে, সাংবাদিকরা কী করেছে, এখন যে সমস্ত মিডিয়া আছে, সে সমস্ত মিডিয়াগুলো কেন লিখছে না? কে বাধা দিচ্ছে? আপনি বলেন! আপনারা নাম ধরে ধরে যে সাংবাদিকরা যেখানে আছে, সে সাংবাদিকদের সম্পর্কে তারা কী করেছে, না করেছে— কেউ যদি যে যার মতো করে লিখতে পারে, তো লিখুক। লিখলে তো একটা জনমত তৈরি হবে।”
অনুষ্ঠানে সালেহ শিবলী বলেন, “আর গণমাধ্যমের থ্রেটের (হুমকির) কথা একজন বলছিলেন যে…হুমকি দেওয়া। প্রথম কথা হচ্ছে যে, এই সরকার আসছে আমাদের মনে হয়—১৩০ দিন হলো আমাদের। আমার মনে হয় এদের কোনো অভিযোগ নাই যে কেউ হুমকি দেয় কিংবা হুমকি দিয়েছে, কিংবা কোনো কথা বলেছে।
“অ্যাটলিস্ট যারা মোটামুটি হুমকি-ধামকি দিতে পারে কিংবা কথাবার্তা বলতে পারে, আপাতত আমিও দুই-একটা জায়গায় কথাবার্তা বলতে পারি—তা আমি বলি নাই। এইতো বললাম, এখন পর্যন্ত বলি নাই।”
কারাবন্দি সাংবাদিকদের ‘দ্রুত মুক্তি’ দাবি প্রবাসী ৯৩ সাংবাদিকের
বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন, তাদের মামলাকে ‘মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বর্ণনা করে ‘দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি’র দাবি জানিয়েছে প্রবাসী ৯৩ জন সাংবাদিক।
তারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, “বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বানোয়াট ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার, পেশাগত নিপীড়ন এবং ভয়ভীতির উদ্বেগজনক পরিবেশের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। প্রায় তিনশত সাংবাদিক সরকার ও তাদের পক্ষের লোকদের প্রত্যক্ষ জুলুমের শিকার হয়েছেন।
“অনেক সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে আছেন, কেউ চাকরি হারিয়েছেন, আবার কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব কাজে সরকার আইন-আদালতকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।”
কারাবন্দি সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে সম্প্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, এ পদক্ষেপ দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘উদ্বেগের’ সৃষ্টি করেছে। গত ২১ মে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
“…সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নমূলক মামলা, হয়রানি ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। দেশ-বিদেশে কর্মরত শতাধিক সাংবাদিকের পক্ষ থেকেও একাধিকবার বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে।”
৯৩ প্রবাসী সাংবাদিকদের পক্ষে এ বিবৃতি পাঠিয়েছেন বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোরের সম্পাদক তৈমুর ফারুক তুষার। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন—মঞ্জরুল ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন, শাবান মাহমুদ, মাসুদা ভাট্টি, লাভলু আনসার, জুয়েল রাজ, সুমন দেবনাথ, নুরুন্নবী আলী, দেবেশ বড়ুয়া।
তারা বলছেন, “গত ১৭ মে ২০২৬ সম্পাদক পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা জমা দেয়। সম্পাদক পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ৯৪ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হত্যা মামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। সংগঠনটি এসব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানালেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
“আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের প্রতি যে দমন-পীড়নের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারে বর্তমান সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।”
সাংবাদিকদের পেশাগত কাজকে ‘অপরাধ হিসেবে বিবেচনার প্রবণতা’ বন্ধের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং বাংলাদেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার অনুযায়ী সাংবাদিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে হবে।
এছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী’ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এর কার্যালয় খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।

