ইরানে ৯০টি আধুনিক মিসাইল লঞ্চার সরবরাহ রাশিয়ার, গোপন নথি ফাঁস

প্রান্তডেস্ক: মস্কো ও তেহরানের মধ্যকার সামরিক সহযোগিতার গভীরতা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে একগুচ্ছ ফাঁস হওয়া প্রতিরক্ষা শিল্প নথি। তথ্য অনুযায়ী, উন্নত প্রযুক্তির নির্দেশিত বা গাইডেড মিসাইলের জন্য ইরানকে ৯০টি লঞ্চার সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল রাশিয়া।
রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মিসাইল ও লঞ্চার প্রস্তুতকারী নকশাকারক প্রতিষ্ঠান ‘ভিম্পেল’-এর ২০২৪ সালের মে মাসে তৈরি করা একটি উৎপাদন সময়সূচি বা প্রোডাকশন শিডিউলে ‘কে-১০’ নামে একটি রপ্তানি চুক্তির অধীনে ৯০টি লঞ্চারের অর্ডারের তালিকা রয়েছে।এমনকি পৃথক অভ্যন্তরীণ কাগজপত্রেও ‘কে-১০’ বলতে সরাসরি ইরানকেই নির্দেশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ মূলত মস্কোর জন্যই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে এনেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই ইরানের প্রতি মস্কোর সমর্থনের বিষয়টি লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। গত মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন যে, তেহরানকে সহায়তার জন্য রাশিয়া ‘খুব সামান্যই, কিংবা প্রায় কিছুই করছে না’।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর খুঁজে পাওয়া তথ্যের বড় ফারাক রয়েছে। ইউরোপীয় সংস্থার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে টার্গেট করতে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ও স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহ করে সহায়তা করছে রাশিয়া। এমনকি ইউরোপীয় গোয়েন্দারা সতর্ক করেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তেহরানের হাতে বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে মস্কো।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সেই সময় থেকেই তেহরান রাশিয়ার কাছে ‘শাহেদ’ অ্যাটাক ড্রোন সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে রাশিয়া নিজের দেশেই উৎপাদন করা শুরু করে।
অবশ্য বর্তমান সংঘাতে ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের খবর বরাবরই অস্বীকার করে আসছে মস্কো। এর আগে ২০২৫ সালে দুই দেশ যৌথভাবে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা চুক্তির মতো পারস্পরিক পূর্ণ প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা এই চুক্তিতে রাখা হয়নি। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরান ও মস্কো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে।
চলতি অক্টোবর মাসেই জ্যেষ্ঠ রুশ ও ইরানি কর্মকর্তারা তিনটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, যা উভয় সরকারের কাছেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তোলে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্কের যাতে কোনো অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছে মস্কো। তাছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধে অস্ত্রের চাহিদার কারণে রাশিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাত ইতিমধ্যেই চরম চাপের মুখে থাকায় ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও দেশটি কিছু সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে।
ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের ভেতরের এই সংকট ও চাপের চিত্রও ফুটে উঠেছে। ২০২৪ সালের মে মাসের একটি চিঠিতে ‘ভিম্পেল’ সতর্ক করে জানিয়েছিল যে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহে বিলম্ব ঘটলে মিসাইল লঞ্চারের সংযোজন বা অ্যাসেম্বলি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোও চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

