প্রান্তডেস্ক:দেশের অন্যতম প্রাচীন জাদুঘর ও বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের বিস্তৃত ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. সফিকুল ইসলাম। ‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ নামে বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশ। একই প্রকাশনা থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে নিয়ে ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ’ শিরোনামে তার আরেকটি বই প্রকাশিত হয়েছে।
সফিকুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে লেখালেখি করছেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে নিয়েও তার একটি প্রবন্ধ ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে।
জুলাই ২০২৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৪২। বইটির প্রকাশনা-তথ্য অনুযায়ী, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের বিস্তৃত ইতিহাস নিয়ে বাংলা ভাষায় এটিই প্রথম গ্রন্থ। এতে মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠা, প্রত্নসম্পদ, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, গ্রন্থাগার, প্রকাশনা ও সংশ্লিষ্ট ইতিহাস নানা দিক থেকে তুলে ধরা হয়েছে।
সফিকুল ইসলামের ‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ বইটিতে বরেন্দ্রভূমির পরিচয়, মিউজিয়াম কী ও কেন, প্রত্নসম্পদ ও প্রত্ন-আইন, অবিভক্ত বাংলায় ইতিহাসচর্চা ও মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট, বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি এবং বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘রাজশাহী মিউজিয়াম’ নামে প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ, বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন, রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের কার্যক্রম শুরু, রাজশাহীতে প্রত্নমেলা আয়োজন, সমিতির নিবন্ধন ও মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার অনুমতি, মিউজিয়াম ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাথমিক তহবিল গঠনের ইতিহাসও বইটিতে স্থান পেয়েছে।
গ্রন্থটিতে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রত্নপরিচয়, নয়টি প্রত্নস্থলের খনন ও সেখান থেকে পাওয়া প্রত্ননিদর্শন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মিউজিয়ামের ভূমিকা, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, ‘গৌড়রাজমালা’ ও ‘গৌড়লেখমালা’র মতো গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ, গৌড়কবি শেখ জাহিদ, গবেষণাকেন্দ্র চালু এবং মিউজিয়ামের সঙ্গে যুক্ত পণ্ডিত ও গবেষকদের অবদানসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ’ ৫৫০ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে। বইটিতে ১৬টি অধ্যায় ও পরিশিষ্টে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের জীবন, ইতিহাসচর্চা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের প্রারম্ভিক জীবন, বাংলার ইতিহাসচর্চায় তার ভূমিকা, ইতিহাসবিষয়ক পত্রিকা, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠায় তার অবদান, অন্ধকূপহত্যা নিয়ে তার গবেষণা, ‘সিরাজদ্দৌলা’ রচনা, ‘গৌড়রাজমালা’ ও ‘গৌড়লেখমালা’, রাণী ভবানী, গোলাম হোসেন, বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে ইতিহাস নিয়ে মতবিরোধ এবং জীবনের শেষ সময়সহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে।
এদিকে গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহীর সাধারণ গ্রন্থাগারে বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কথাপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বই দুটির বিষয়বস্তু, ইতিহাসচর্চায় এর প্রয়োজনীয়তা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
লেখক মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলার ইতিহাসচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সম্পর্কে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীরই বিস্তারিত জানা নেই। আমি চেয়েছি তার ইতিহাসচর্চা ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে। একই সঙ্গে দেশের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রকৃত ইতিহাসও পাঠকদের সামনে আনতে চেয়েছি।’
তিনি বলেন, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে কী কী প্রত্ননিদর্শন রয়েছে, কীভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর পেছনে কারা কাজ করেছেন—এসব বিষয়ও অনেকের কাছে অজানা। বইটিতে মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে শুরু করে এর প্রত্নসম্পদ, খনন, গবেষণা ও প্রকাশনাসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
সফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের মধ্যে বাংলার ইতিহাসচর্চার প্রকৃত ধারাকে তুলে ধরাই আমার এই ছোট্ট প্রয়াস। আমি চাই, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের মতো ইতিহাসসাধক এবং বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম আরও জানুক এবং ইতিহাসচর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠুক।’
কথাপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে নিয়ে প্রকাশিত বই দুটি শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয়, ইতিহাস ও গবেষণার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানাতে বই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি লেখক সফিকুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে বই দুটির বহুল প্রচারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।