ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আজ

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় র্যাংকিং নিয়ে কাজ করা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েবমেট্রিক্সের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং ২০২৩- এর তথ্যানুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১২২৫ তম।
বাংলাদেশের সেরা ৫০টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। এর আগে বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান ছিল ১৫৯৩ তম। সুতরাং বৈশ্বিক বিবেচনায় অনেক এগিয়েছে। ইতিহাস ঐতিহ্যে কোন অংশে কমতি নেই। বহুল আলোচিত প্যারিস রোড। যা ক্যাম্পাসের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আবেগের চিহ্ন এবং বহু আন্দোলন সংগ্রামের স্মৃতি বহন করছে।
প্যারিস রোড, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার রোড এবং শহীদ মিনার রোডের বিশাল বৃক্ষরাজি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হরেক রকম বৃক্ষ এবং ফুল গাছের সমারোহে একেক ঋতুতে একেকরকম রূপ ধারণ করে। জোহা হল সংলগ্ন বধ্যভূমি ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিপট থেকে জানা যায় হানাদার বাহিনীরা জোহা হলকে তাদের ক্যাম্প বানিয়ে রেখেছিল।
সেখানে আশে পাশের মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন করে বধ্যভূমির স্থানে নিয়ে স্তূপাকারে ফেলে দিত। তখন এলাকার মানুষ লুকিয়ে গিয়ে সেখান থেকে জীবিতদের উদ্ধার করতো। বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোতে রাবির অনেক শিক্ষার্থী আছে। আরেকটি গর্বের বিষয় হলো দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং ফার্স্ট লেডি দু’জনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।
বর্তমানে শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তির ঘর শূন্যই বলা চলে। এ বিশাল সংখ্যার বিপরীতে বাস আছে মাত্র ৩৮টির মতো। যার মধ্যে কয়েকটি আবার অকেজো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মোহে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন সবারই। কিন্তু এখানে পড়তে এসে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতারও সাক্ষী হতে হয়। যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো হলে সীট পাওয়া নিয়ে।
ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ টি হলকে এমনভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছে যে নিজের সীটে উঠতে গেলেও হয় তাদের রাজনীতির দলে নাম লেখাতে হবে না হলে কয়েক হাজার টাকা দিতে হবে।
অথচ প্রতিটি হলের দায়িত্বে একজন করে প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের উর্ধ্বে কেউ নাই। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম বর্ষেই হলের আবাসিকতা হয় না। কিন্তু ওই যে দলে নাম লেখানো বা টাকা দেওয়ার এই পন্থা অবলম্বন করলে সহজেই যেকোনো সময় সীট মিলবে। আর এমনও শিক্ষার্থী আছে যে নিয়মানুযায়ী উঠার চেষ্টা করে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেছে কিন্তু হলে উঠতে পারে নি। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কেই রাজনীতি খুবই ভয়াবহভাবে গ্রাস করে নিয়েছে।
হলের ডাইনিংয়ের খাবার, ইন্টারনেটের অপর্যাপ্ততা নিয়েও শিক্ষার্থীরা অসন্তুষ্ট। ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে এসব নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও এগিয়ে আসেন না। অথচ দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক ছিলেন। যিনি স্বৈরশাসকদের হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে সবার সামনে গিয়ে বুক পেতে দিয়েছিলেন। অথচ বর্তমান শিক্ষকদের অবস্থাটা এমন যে, তারা ক্লাস করাবে আর মাস শেষে বেতন পাবে ব্যস তাদের দায়িত্ব এখানেই শেষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৮টা বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটাতে সেশনজট লেগেই থাকে, শিক্ষকদের আন্তকোন্দলের বলি হয় শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের গায়ে পোষ্য কোটা নামক একটি কালো দাগ লাগিয়ে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, আত্মঘাতী একটি নিয়ম। হাজার হাজার শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করে চান্স পায়। অনেকেই পরিশ্রমের সুফলের স্বাদ পেতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু এই পোষ্য কোটার বলে একজন শিক্ষকের ছেলে হয়ে ফেইল করেও ভর্তির সুযোগ পায়। শিক্ষক সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। এই শিক্ষকদের থেকে শিক্ষার্থীরা কি শিখবে সেটিও ভাবার অবকাশ রাখে না।
ফেইল করা শিক্ষার্থীই আবার এই কোটার বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী হচ্ছে। এভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারতন্ত্রে রূপ নিচ্ছে। শুধুমাত্র এখানেই তারা স্বায়ত্তশাসিত নামক শব্দটির সুর টানেন, সে হিসেবে এটি আইনের অপপ্রয়োগও। প্রতিষ্ঠার এত বছর পরেও এমন নিয়ম ক্যাম্পাসের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রশাসনের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি করে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। পোষ্য কোটা বাতিলের জন্য প্রতি বছরই সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে, এই পদ্ধতি বাতিল সময়ের দাবি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো, চলতি বছরের মার্চ মাসে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ।
কয়েকদিনের মধ্যে কালবেলা পত্রিকায় প্রতিবেদনে দেখা যায় বাকবিতন্ডা শুরু হলে উপাচার্য নিজে না গিয়ে বা প্রশাসনকে না পাঠিয়ে ছাত্রসংগঠনের নেতাকে সেখানে পাঠান। তারও বেশ কিছুক্ষণ পর ছাত্র–উপদেষ্টা সেখান যান এবং তার ভূমিকায় পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যার ফলশ্রুতিতে কয়েকশো শিক্ষার্থী আহত হয়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা যদি এই হয়! তাহলে বাকিগুলোর কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। স্বায়ত্তশাসিত বলা হলেও রাজনীতি ঘুন পোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদন্ডকে আক্রান্ত করে ফেলেছে। হলগুলো রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এমনভাবে কব্জা করে নিয়েছে আর প্রশাসন এতটাই অসহায় যে প্রাধ্যক্ষের সীল, স্বাক্ষর না লাগলে তাকে হলে যাওয়ার দরকার ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত জ্ঞান চর্চা, গবেষণার জায়গা।
সেখানে রাজনীতির এত প্রভাব মোটেও ভালো কিছু বয়ে আনে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর কতশত গবেষণা করে দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে কাজে লাগাচ্ছে। সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর হলের সীট পাওয়া আর খাবারের মান নিয়ে সমালোচনা করতে করতেই লেখাপড়া শেষ হয়ে যায়। এই যদি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের অবস্থা! তাহলে শিক্ষাব্যবস্থা কি অবস্থায় আছে আর এর ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারের দিকে তা মোটামুটি নিশ্চিত। ৭০ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে অথচ দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান নেই। এটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। রাজনীতির কষাঘাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রাখতে হবে।
এজন্য আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। বর্তমানে ২৪ তম উপাচার্য দায়িত্বরত আছেন। অর্থাৎ এর আগেও ২৩ জন উপাচার্য সাবেক হয়েছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতির লেলিহান শিখার হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা সম্ভবত কেউই করেনি। সবার আগে উচিত শিক্ষার্থীদের থাকা আর খাওয়ার বিষয়টা নিশ্চিত করা। তবে আনন্দের বিষয় হচ্ছে দেশ এবং দেশের বাইরে খ্যাত অনেক ব্যক্তিত্ব এই ক্যাম্পাসের সাবেক শিক্ষার্থীর পরিচয় বহন করছে।
উল্লেখযোগ্য হলো প্রয়্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি কথাসাহিত্যিক ডা. সেলিনা হোসেন প্রমুখ। এরকম কিছু ব্যক্তির অনন্যকীর্তির জন্য মতিহারের এই সবুজ চত্বরের নাম ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে রেখেছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
01304-618187(দৈনিককরতোয়া’রসৈজন্যে)

