শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা দিয়ে কবি আখতার হুসেনকে শেষ বিদায়

প্রান্তডেস্ক:সূর্য তখন মাথার উপরে খাড়া তপ্ত রোদে কবি ও শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেনকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে সমবেত হলেন শত মানুষ।
শুক্রবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় আখতার হুসেনের মরদেহ।
স্মৃতিচারণ করে সেখানে প্রয়াতের ছোট ছেলে প্রমিত হুসেন বলেন, “আমার বাবা একজন মানবিক মানুষ ছিলেন।আমার বাবা একদিন রাতে খালি গায়ে বাসায় ফিরেছেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা খালি গায়ে কেন?’ তিনি বললেন, ‘পথে এক ছেলেকে দেখেছি, তাকে কয়েকজন মেরে তার শার্ট ছিড়ে দিয়েছে। তাই আমি তাকে শার্টটা দিয়ে এসেছি’। তিনি সবসময় মানুষকে ভালোবাসতেন, সবার ভালো চাইতেন।”
তিনি বলেন, “আমার বাবা যখন অসুস্থ, এবার তিনি আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার সহকর্মী শিল্পীদের দৈন্যদশা দেখে খুব বেদনাতুর হয়েছিলেন। আমরা দেখেছি বাংলাদেশে অনেক শিল্পী একটু যে চিকিৎসা করার, সেই সামর্থ্যও নেই।
“তাই আমার বাবা শেষবারের মত বলে গিয়েছিলেন, ‘আর কোনো শিল্পী যেন এ কষ্টে না থাকে’। আপনারা শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবেন—আমাদের এই কামনা।”
বেইলি রোড থেকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা তাসলিমা আকতার বলেন, “আখতার ভাই আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা। একজন মানুষ সাহিত্য, রাজনীতি, সংগীত—কত কিছুতেই না অবদান রাখলেন। এমন মানুষের প্রস্থান আমাদের জন্য বেদনার।”
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা রাজিব হাসান বলেন, “আমরা যখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, তখন এক সোনালী অধ্যায় ছিল। অসাধারণ মানুষদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ ছিল। আখতার ভাই তাদের একজন।
“আমার যখনই কোনো কিছু নিয়ে দ্বিধা সৃষ্টি হতো, আমি আখতার ভাইয়ের কাছে যেতাম। অনেক সময় ফোন করতাম। ধমক দিয়ে বলত, ‘হ্যাঁ বলো’। তারপর কী করব বা করণীয়—কীসব নিয়ে দিকনির্দেশনা দিতেন। আমি আজ এক রাজনৈতিক গুরু হারিয়েছি।”
শহীদ মিনারে শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে সবশেষে জাতীয় সংগীত ও ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় আখতার হুসেনকে। এরপর এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেয় পুলিশ।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে পাঠানো হয়। সেখানে স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আখতার হুসেনের মৃত্যু হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন আখতার হুসেন। তার ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিক সংখ্যক লেখার (ভুক্তি) কৃতিত্বও তার।
তার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
সাহিত্যে অবদানের জন্য আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।
বাংলা একাডেমির ফেলো আখতার হুসেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। সংগঠনটির প্রথম দিকের বহু নাটক রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন তিনি।
শিশুসংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সংগঠক হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আখতার হুসেন।
ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সংগীত ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান, শোষণের কারাগার ভাঙবোই’ এবং খেলাঘরের ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তারই লেখা।

