প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত পদক্ষেপ:: তেলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরছে, দ্রুত কমবে লোডশেডিং

প্রান্তডেস্ক:প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ত্বরিত পদক্ষেপে লোডশেডিং কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাসশিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও শিল্প—দুই খাতের সংকট একসঙ্গে মোকাবেলায় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে শিগগিরই শিল্পের দীর্ঘদিনের গ্যাসসংকট এবং বিদ্যুৎ খাতের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের সিদ্ধান্তের কথা আমাদের জানিয়েছে। বকেয়া বিল পরিশোধ ও হিসাব হালনাগাদ হলে কেন্দ্রগুলো আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারবে। বর্তমানে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বকেয়া বিল পরিশোধ করা হলে আরো প্রায় দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বকেয়া বিল না পাওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছিল না। ফলে আমাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। বকেয়া পরিশোধ করা হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদনে যেতে পারবে। এতে একদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং লোডশেডিং কমবে, অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।’
ডেভিড হাসনাত আরো বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ বিল বকেয়া জমেছে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো। গড়ে প্রায় ছয় মাসের বিল বকেয়া। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে। সরকার তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যার কারণে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়েছে।’
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, তখন সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত, সিন্ডিকেশন, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এই লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে হতো না সাধারণ মানুষকে। ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ এবং আগাম পরিকল্পনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, আপাতত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দ্রুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশও আসতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) যথাসম্ভব ফার্নেস অয়েল মজুদ করতে বলা হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন তেল বিতরণ কম্পানিতে তেলের মজুদ বাড়াতে বেশি করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান দামের কারণে পরিস্থিতিও কিছুটা বদলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও কাঙ্ক্ষিত সময়ে এলএনজি সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২৬ আগস্টের জন্য নির্ধারিত কার্গোও পাওয়া যায়নি। ফলে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘সরকার লোডশেডিং কমাতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে শিল্প খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে শিল্প খাতে গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত। এটি আদর্শ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে বিদ্যমান সংকট বিবেচনায় এ মুহূর্তে এর বিকল্পও নেই। এর মাধ্যমে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহও বাড়বে।’
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ করা হলে তারা দ্রুত ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করে উৎপাদনে ফিরতে পারবে। এতে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও যেন কয়লার অভাবে বন্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রকে অন্তত ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত।’
অধ্যাপক ম. তামিম আরো বলেন, ‘সাধারণত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় ব্যয়বহুল। বর্তমানে এলএনজির দাম প্রায় ২৪ ডলারে থাকায় হিসাবটি কিছুটা বদলে গেছে। ফলে এই মুহূর্তে ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো উচিত নয়। গ্যাসের সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক রিটার্ন আসে শিল্প খাত থেকে। দীর্ঘদিন গ্যাসের সংকটে দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ফিরিয়ে এনে উৎপাদন সচল করার উদ্যোগটি খুবই জরুরি ছিল।’
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৩। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ৭৮। গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা পাঁচ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১৯ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক সাত হাজার ২০৩ মেগাওয়াট, ডিজেল ৭৬৮ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এক হাজার ১২৯ মেগাওয়াট, আদানিসহ আমদানি বিদ্যুৎ দুই হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট।
জানা গেছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছিল। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় অগ্নিকাণ্ডে এক্সিলারেটের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে টার্মিনালটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়। মেরামত শেষে টার্মিনালটি আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু করলেও এলএনজি মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে আবারও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত শনিবার থেকে দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
গতকাল সোমবার পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ৭৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৩৮১ মিলিয়ন ঘনফুট, কয়েক দিন আগেও এলএনজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গিয়েছিল। সরকার এখন ওই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠকে শিল্প খাত সচল রাখার স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া অর্থনৈতিক দিক থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, রাজস্বসহ সব ক্ষেত্রেই সরাসরি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়।

