আপাতত থামল কৃষক আন্দোলন, মোদীর আশ্বাসে কি গলবে কৃষকদের ক্ষোভ?
প্রান্তডেস্ক:পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তের শম্ভু বর্ডারে আপাতত সংঘাত এড়ানো গেল। হাজার হাজার কৃষকের দিল্লি অভিযানে কড়া ব্যারিকেড তুলে দাঁড়িয়েছিল হরিয়ানা পুলিশ। ফলে কিষান ঘাটে ‘কিষান মহাপঞ্চায়েত’-এ যোগ দিতে যাওয়া কৃষকদের পথেই থামতে হয়। কয়েক ঘণ্টার টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক আশ্বাস এবং হরিয়ানা প্রশাসনের নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিতে কৃষকরা অবস্থান তুলে নেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এতে কি আন্দোলনের ইতি, নাকি এটি শুধুই সাময়িক বিরতি?
কৃষকদের মূল দাবি ছিল, কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহানের সঙ্গে দ্রুত বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রস্তাবিত ভারত-আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে সরাসরি আলোচনা করতে হবে। হরিয়ানা প্রশাসন ৮-১০ দিনের মধ্যে সেই বৈঠকের আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি আটক কৃষক নেতাদের মুক্তির বিষয়েও ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপরই দিল্লি মার্চ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন আন্দোলনকারীরা।
তবে কৃষক সংগঠনগুলির বক্তব্য স্পষ্ট—এটি কোনও আত্মসমর্পণ নয়। বৈঠক না হলে কিংবা আলোচনায় সন্তোষজনক সমাধান না এলে আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকারে ফিরতে পারে। কৃষক নেতা সর্বণ সিংহ পন্ধের জানিয়েছেন, পরবর্তী বৈঠকেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন বিস্তারের রূপরেখা ঠিক করা হবে।
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত-আমেরিকা প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি। কৃষকদের আশঙ্কা, এই চুক্তি কার্যকর হলে আমেরিকা থেকে কম শুল্কে সয়াবিন, ভুট্টা ও দুগ্ধজাত পণ্য ভারতে প্রবেশ করবে। ফলে দেশীয় কৃষক, বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক চাষিরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন এবং কৃষি আয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করেই যে কোনও বাণিজ্য চুক্তি হবে এবং কৃষি খাতে কোনও আপস করা হবে না।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এই আন্দোলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন, বিরোধীদের প্রতিবাদ এবং সংসদের বাইরে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক চাপের আবহে সরকার নতুন করে বৃহৎ কৃষক আন্দোলনের ঝুঁকি নিতে চায়নি বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। সেই কারণেই প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস, পরে প্রশাসনিক আলোচনার পথ—দুই দিক থেকেই পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার আপাতত সংঘাত এড়াতে সফল হলেও প্রকৃত পরীক্ষা হবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে। যদি কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ফলপ্রসূ না হয় বা কৃষকদের আশঙ্কা দূর করার মতো কোনও স্পষ্ট রূপরেখা না আসে, তাহলে দিল্লি অভিমুখে আরও বড় কৃষক মিছিল দেখা যেতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতায় কৃষক সংগঠনগুলির মধ্যে সরকারি আশ্বাস নিয়ে সংশয়ও প্রবল।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মত, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের রপ্তানির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু কৃষি খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষুদ্র কৃষকদের উদ্বেগ অমূলক নয়। ফলে সরকারের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অন্যদিকে দেশের কৃষকদের আস্থা বজায় রাখা।
সব মিলিয়ে, শম্ভু সীমান্ত থেকে ট্র্যাক্টর আপাতত ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু কৃষকদের দাবি এখনও অমীমাংসিত। তাই এই আন্দোলন শেষ হয়নি; বরং বলা যায়, সরকারকে দেওয়া সময়সীমা শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের বৈঠক ও কেন্দ্রের অবস্থানই নির্ধারণ করবে—মোদীর আশ্বাসে কৃষকদের ক্ষোভ প্রশমিত হবে, নাকি আবারও দিল্লির পথে নামবে হাজার হাজার কৃষক।


