ইবি শিক্ষক খুন: বিভাগের দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার নির্দেশনায় হত্যার অভিযোগ স্বামীর
আসমা সাদিয়া রুনা
মামলায় আসামি হিসেবে তিনি চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। এছাড়া অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করলেও কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। মামলায় প্রথম আসামি করা হয়েছে রুনাকে ছুরিকাঘাতকারী সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক অফিস সহকারী ফজলুর রহমানকে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন রুনার বিভাগের সহকর্মী দুই শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। শ্যাম সুন্দর আগে বিভাগটির সভাপতি ছিলেন। মামলার অপর আসামি হলেন বিভাগটির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস। কিছুদিন আগে তাকে বিভাগ থেকে উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা ছাত্রী হলে বদলি করা হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া রুনা বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে বিভাগের পূর্ববর্তী সময়ের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব বুঝিয়ে দেননি আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর।
এজাহারে তিনি আরও বলেন, ‘এক পর্যায়ে ফজলুর রহমান বিভাগের শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনেই রুনার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেন। পরে বিষয়টি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. রোকসানা মিলিকে অবহিত করা হলে তিনি বিভাগে একাডেমিক কমিটির সভা আহ্বানের নির্দেশ দেন। সভায় প্রশাসনিক কারণে ফজলুর রহমানকে সমাজ কল্যাণ বিভাগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত শিক্ষক হাবিবুর রহমান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।’
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ‘হাবিবুর রহমান এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে ফজলুর রহমানকে বিভাগেই বহাল রাখার বিষয়ে রুনাকে চ্যালেঞ্জ জানান। এছাড়া তিনি প্রভাষক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ায় বিভাগের সভাপতি হওয়ার দুরভিসন্ধি দেখতে থাকেন। এর মধ্যে ফজলুর রহমানকে প্রশাসনিকভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয় এবং কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমারকেও ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রী হলে বদলি করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমানের সরাসরি প্ররোচনা ও নির্দেশনায় ফজলুর রহমান ধারালো ছুরি নিয়ে রুনার নিজ অফিস কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে তাকে হত্যা করেন।’ রুনার সাথে পূর্বে সংঘটিত এসব ঘটনা প্রায়ই তিনি তার স্বামীকে জানাতেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানলে অভিযুক্ত আসামি সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বলেন, ‘আমাদের এক সহকর্মী মারা গেছেন। এটা নিয়ে আমরা খুবই শোকাহত। তার সঙ্গে আমাদের এমন কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না যে, আমরা হত্যার নির্দেশ দেব। বিষয়টি তদন্তাধীন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। একজন মানুষ স্বজনহারা হয়েছেন। আমরা তো শিক্ষক, কখনও মানুষকে হত্যা করতে পারি?’
আরেক শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি একজন মানুষ হিসেবে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। যদি আমি নিজেও এর সাথে জড়িত থাকি, তাহলে আমি নিজেরও শাস্তি দাবি করছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অপর অভিযুক্ত বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাসকে কল দিলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে রুনাকে হত্যার দায় স্বীকার করে লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন মামলার মূল আসামি ফজলুর রহমান। বুধবার রাত থেকে তিনি কথা বলতে না পারলেও সাড়া দিচ্ছেন। কিছু জানতে চাইলে কলম দিয়ে লিখে উত্তর দিতে পারছেন।
পুলিশ ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বুধবার রাতেই পুলিশের কর্মকর্তারা তার দুই পাতার লিখিত বক্তব্য নিয়ে গেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বিভাগীয় প্রধান তাকে বদলি এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় তার মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে স্বীকার করেন।
প্রসঙ্গত, বুধবার বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের ২২৬ নম্বর কক্ষে আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাত করেন কর্মচারী ফজলুর রহমান। পরে একই কক্ষে ওই কর্মচারীও নিজ গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে ওই শিক্ষিকার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাদ জোহর কুষ্টিয়া পৌর ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তাকে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। (সৌজন্যে:দৈনিকসমকাল)



