মঙ্গলে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার ইঙ্গিত, বায়ুমণ্ডলে মিলল বিশেষ গ্যাস
ছবি : রয়টার্স প্রান্তডেস্ক:মঙ্গলে এখনো আগ্নেয়গিরির ভূতাত্ত্বিক কার্যক্রম চলতে পারে—এমন ইঙ্গিত পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গ্রহটির একটি প্রাচীন আগ্নেয়গিরির আশপাশের ফাটলের ওপর বায়ুমণ্ডলে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড নামের বিশেষ গ্যাসের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় সাধারণত এ গ্যাস নির্গত হয়। নতুন এই আবিষ্কার মঙ্গলের অভ্যন্তরে এখনো ম্যাগমার কার্যক্রম থাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) ও রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থা রসকসমসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক্সোমার্স ট্রেস গ্যাস অরবিটার মহাকাশযানের মাধ্যমে গ্যাসটির অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত আলবা মনস নামের বিশাল আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের নিম্ন বায়ুমণ্ডলে এর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
গবেষণাটির সহপ্রধান লেখক ও সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোলিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের গ্রহবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল মেজ বলেন, হাইড্রোজেন ক্লোরাইডের সবচেয়ে সম্ভাব্য উৎস হলো আগ্নেয়গিরি থেকে গ্যাসের নির্গমন। আলবা মনস অঞ্চলের পৃষ্ঠে থাকা অসংখ্য ফাটল দিয়ে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এসব ফাটলের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমার আধারের সংযোগও থাকতে পারে।
গবেষণাটির আরেক সহপ্রধান লেখক ও রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গ্রহবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ত্রোখিমোভস্কি জানান, ম্যাগমা ভূগর্ভ থেকে ওপরে ওঠার সময় চাপ কমে যায়।
মঙ্গলে আগ্নেয়গিরির তৎপরতার প্রমাণ
সৌরজগতের যেসব মহাজাগতিক বস্তুতে বর্তমানে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা নিশ্চিতভাবে দেখা গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পৃথিবী, শুক্র এবং বৃহস্পতির উপগ্রহ আইও।মঙ্গলের পৃষ্ঠ অতীতে ব্যাপক আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। গ্রহটিতে সৌরজগতের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরি অলিম্পাস মনসও রয়েছে। তবে বর্তমানে মঙ্গলে আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম চলছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, কয়েক মিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলে আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলেও বর্তমান সময়ে ম্যাগমার সক্রিয়তার সরাসরি প্রমাণ আগে পাওয়া যায়নি। নাসার ইনসাইট ল্যান্ডারের ভূকম্পন পরিমাপক যন্ত্রে শনাক্ত হওয়া মঙ্গলের ভূকম্পনও আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, আলবা মনসের উত্তর ঢালে গ্রীষ্মের শুরুতে প্রতিবছর হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বছরের অন্য সময় ফাটলগুলো বরফে বন্ধ থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মের শুরুতে বায়ুর তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলে যায়। তখন ভূগর্ভে আটকে থাকা আগ্নেয়গিরির গ্যাস বায়ুমণ্ডলে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
মঙ্গলে প্রাণের সন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে আবিষ্কার
মঙ্গলে ভূগর্ভে ম্যাগমার অস্তিত্বের সম্ভাবনা সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। কারণ, আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা থাকলে গ্রহটির উপরিভাগের নিচে কিছু এলাকায় এখনো তাপ বজায় থাকতে পারে।
মঙ্গলের ভূগর্ভে তরল পানির বিশাল আধার থাকার ইঙ্গিত আগেই পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীতে কয়েকশ কোটি বছর আগে প্রাণের উদ্ভবও ভূগর্ভস্থ উষ্ণ পানির পরিবেশ বা হাইড্রোথার্মাল ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।
গবেষক ত্রোখিমোভস্কির মতে, ভূগর্ভে ওঠা ম্যাগমা শিলাস্তরের মধ্যে থাকা পানির সংস্পর্শে এসে সেটিকে উত্তপ্ত করতে পারে। এতে এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা মঙ্গলের প্রতিকূল উপরিভাগ থেকে সুরক্ষিত। এসব উষ্ণ ভূগর্ভস্থ পরিবেশে অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও অনুকূল পরিস্থিতি থাকতে পারে।
তবে মঙ্গলে বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি। বরং নতুন আবিষ্কারটি গ্রহটির ভূগর্ভে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকতে পারে কি না, তা অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।

