চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে রেকর্ডসংখ্যক নেতা বহিষ্কার, অনুপস্থিতিও সর্বোচ্চ

প্রান্তডেস্ক:চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও শৃঙ্খলা জোরদারের অংশ হিসেবে রেকর্ডসংখ্যক জ্যেষ্ঠ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সদস্যদের অনুপস্থিতির হারও মাও সে তুংয়ের পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৈঠকে ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বেইজিংয়ে পার্টির ২১তম কংগ্রেস আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। ২০২২ সালে গঠিত এই কমিটিতে পূর্ণ ও বিকল্প সদস্য মিলিয়ে শুরুতে ছিলেন ৩৭৬ জন।
তবে দলটি এই পরিস্থিতিকে দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেনি।
লন্ডনের কিংস কলেজের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন বলেন, দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলটির প্রধান বার্তা হলো, কমিউনিস্ট পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজনের বিপরীতে চীন নিজেদের ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে শীর্ষ নেতারাও বাদ
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সি চিন পিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়ে আসছেন। তাঁর যুক্তি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকলে একসময় দল ও রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে চীনের আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের লাখো মানুষ তদন্তের আওতায় এসেছেন। বাদ পড়েছেন সি চিন পিংয়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং প্রভাবশালী অনেক নেতাও।
বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে ৩৩ জন কর্মকর্তার দলীয় বহিষ্কার আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাবেক পলিটব্যুরো সদস্য মা শিংরুই ও ঝাং ইউশিয়াও রয়েছেন। সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক লিউ জিয়ানচাও এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী জিন ঝুয়াংলংও বহিষ্কৃতদের তালিকায় আছেন।
বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদে দায়িত্বে থাকা পলিটব্যুরোর সদস্যদের মধ্যে তিনজনকে অপসারণ করা হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর কোনো মেয়াদে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।
সি চিন পিংয়ের বক্তব্য ও দলীয় প্রচার থেকে বোঝা যায়, তিনি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, দলকে নিজেদের ভেতরের দুর্বলতা ও অনিয়ম নিয়মিতভাবে দূর করতে হবে।
লন্ডনের টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউটের চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক রুবি ওসমানের মতে, সি চিন পিং স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের অস্থিরতা মেনে নিতেও প্রস্তুত, যদি তা দীর্ঘ মেয়াদে দলীয় ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে।
সামরিক নেতৃত্বেও বড় শূন্যতা
চীনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বদানকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালে দায়িত্ব পাওয়া সাত সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই শুদ্ধি অভিযানে বাদ পড়েছেন। বর্তমানে কমিশনে রয়েছেন সি চিন পিং এবং ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং শেংমিন।
ঝাং শেংমিন মূলত সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী তদারকির দায়িত্বে পরিচিত। এবারের অধিবেশনে তাঁকে পলিটব্যুরোর সদস্য করা হয়েছে। সাধারণত কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যানরা পলিটব্যুরোর সদস্য হন। তবে ১৯৯৪ সালের পর মধ্যবর্তী মেয়াদের কোনো প্লেনামে এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থায় নতুন সদস্য যুক্ত করার ঘটনা ঘটেনি।
এই পরিবর্তন চীনের সামরিক নেতৃত্বে চলমান শুদ্ধি অভিযানের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।
সি চিন পিংয়ের ক্ষমতা আরো বাড়বে?
২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে অনুষ্ঠেয় ২১তম পার্টি কংগ্রেসকে সামনে রেখে চীনের নেতৃত্বে নতুন করে রদবদলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, সি চিন পিং আরো পাঁচ বছর দলের শীর্ষ পদে থাকবেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আরো বেশি আনুগত্য প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। পিপলস ডেইলি ও সিনহুয়া সাম্প্রতিক সম্পাদকীয় ও মন্তব্যে সি চিন পিংকে ঘিরে দল ও জাতির ঐক্য আরো জোরদার করার কথা বলেছে।
তবে নেতৃত্বের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নটি এখনো অনিশ্চিত। কেরি ব্রাউনের মতে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রজন্মগত পরিবর্তন চলছে। কিন্তু সি চিন পিংয়ের ঘনিষ্ঠ প্রবীণ নেতারা কতটা আগ্রহী এবং কতটা সক্ষম হবেন তরুণ নেতাদের বেশি ক্ষমতা দিতে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শেষ করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি দলটি। বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতে নতুন সমস্যা ও বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ওপর স্বাধীন বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ফলে কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দলীয় নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে ধারাবাহিক বহিষ্কার ও নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হওয়ার পরও দলটি কীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে, তা আগামী দিনের বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

