অক্টোবর ১৯৭১ : যে বাংলাদেশ আত্মসমর্পণ করেনি

বিশেষ প্রতিনিধি::ভাবুন, একটি দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সামরিক শাসকেরা নির্বাচনের রায় মেনে নিতে অস্বীকার করছে।
তাই মার্চের সামরিক অভিযান ও ডিসেম্বরের বিজয়ের মাঝখানে অক্টোবর কেবল একটি মধ্যবর্তী সময় নয়। এই মাসে সশস্ত্র প্রতিরোধ, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, রাজনৈতিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি একসূত্রে মিলেছিল। ১৯৭১-এর বহু পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের জন্য এই সময়ের ইতিহাস বোঝা জরুরি। কারণ, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সাধারণ মানুষ কীভাবে একটি মুক্তিসংগ্রামকে টিকিয়ে রাখে এবং ইতিহাস জানতে হলে কেন স্লোগানের পাশাপাশি প্রমাণের ওপরও নির্ভর করতে হয়।
দমেনি প্রতিরোধ
অক্টোবর নাগাদ বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ক্রমেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠা একটি জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কত দিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অভিযান বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানি সেনাদের টহলদলের ওপর অতর্কিত হামলা, সামরিক অবস্থানে আক্রমণ এবং পরিবহন, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত করার মাধ্যমে দখলদার বাহিনীর চলাচল ও রসদ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, প্রতিরোধ ক্রমে আরো সংগঠিত হচ্ছিল এবং বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল।
১৬ অক্টোবরের একটি বাংলাদেশ ফোর্সেস বুলেটিনে বলা হয়, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে গেরিলা অভিযানে চারটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছিল। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। ২৫ অক্টোবরের আরেকটি বুলেটিনে বিভিন্ন সেক্টরে অতর্কিত হামলা, পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ এবং রেল যোগাযোগ বিঘ্নিত করার তথ্য দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশিত এসব বুলেটিন সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে এগুলো ছিল যুদ্ধরত বাহিনীর নিজস্ব প্রতিবেদন। বিশেষ করে হতাহতের সংখ্যা ও অভিযানের সাফল্যসংক্রান্ত দাবিগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উৎসের পরিচয় এবং যুদ্ধকালীন তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। স্বাধীন গবেষণা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে এসব দলিল থেকে প্রতিরোধযুদ্ধের বিস্তার এবং সামরিক নেতৃত্বের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
কৌশলটি ছিল স্পষ্ট—পাকিস্তানি সেনাদের চলাচল সীমিত করা, রসদ সরবরাহে বাধা দেওয়া, দখলদার বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ানো এবং দেখিয়ে দেওয়া যে পুরো ভূখণ্ডে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রতিটি অভিযানের ঝুঁকি ছিল। সেই ঝুঁকির মুখে পড়তেন যোদ্ধারা, আবার সামরিক স্থাপনা ও যোগাযোগপথের আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষও।
অক্টোবর ছিল ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতি ও চাপ তৈরির মাস। তখনো মুক্তিবাহিনী চূড়ান্ত সামরিক আঘাত হানতে পারেনি। কিন্তু তাদের ধারাবাহিক অভিযান পাকিস্তানি বাহিনীকে চাপে রাখছিল এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখছিল।
যুদ্ধের আগুনে পুড়েছিল গ্রামও
১৯৭১ সালের অক্টোবরের ইতিহাস কেবল সামরিক অভিযান, ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো কিংবা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে বোঝা যাবে না। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে নিহত মানুষ, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং সহিংসতায় বিপর্যস্ত জনপদের অভিজ্ঞতা।
বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর পাবনার নাজিরপুরে পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যদের সহায়তায় হামলা চালায়। এতে ৫৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ৫০০ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে এসব বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। গ্রামবাসীদের একত্র করে গুলি বা বেয়নেট দিয়ে হত্যার কথাও পাওয়া যায়।
ঘটনাটি সামরিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতায় স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আনে। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং ঐতিহাসিক গবেষণা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বিপন্ন হয়ে পড়েছিল, এ ধরনের ঘটনা তারই একটি চিত্র তুলে ধরে।
এই সহিংসতার শুরু অবশ্য আরো কয়েক মাস আগে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দমন অভিযান শুরু করে। বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিরোধী শক্তি ও প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়। পরবর্তী মাসগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, যৌন সহিংসতা ও বসতিতে ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী, রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও বিভিন্নভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
এই সহিংসতার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেন। সে সময় এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট। অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। শরণার্থীশিবিরে শিশুদের অনাহার ও রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে।
শরণার্থীর প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে ছিল একটি পরিবার, একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়। সহিংসতার মধ্যে থেকে যাওয়া, নাকি নিরাপত্তার আশায় পরিচিত সবকিছু ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ানো—এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বহু মানুষকে।
তাই শরণার্থী সংকট মুক্তিযুদ্ধের কোনো গৌণ পরিণতি ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের অন্যতম প্রধান মানবিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন। ভারতের অবস্থান নির্ধারণে এবং আন্তর্জাতিক মহলে চাপ বাড়াতে এই সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নির্বাচনের রায় থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম
অক্টোবরের তাৎপর্য বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় যুদ্ধের আগের রাজনৈতিক সংকটের দিকে।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ছিল দলটির। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হয় সামরিক দমন অভিযান।
বহু বাঙালির কাছে নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, অখণ্ড পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়। দমন-পীড়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতও ছড়িয়ে পড়ে।
অক্টোবরেও শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী ছিলেন। অন্যদিকে, এপ্রিলে মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের আশ্রয়ে থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন পরিচালনা করছিল। সরকারের প্রধান প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র ছিল কলকাতা।
অস্থায়ী সরকারের সামনে দুটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ ছিল। একদিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। সরকার বোঝাতে চেয়েছিল, স্বাধীনতার আন্দোলন কেবল একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা নয়; এর ভিত্তি ছিল একটি নির্বাচনে পাওয়া গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা।
১৩ অক্টোবর ঢাকায় নিজ বাসভবনে গুলিবিদ্ধ হন পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর এবং পাকিস্তানি শাসনের সমর্থক আবদুল মোনেম খান। ওই রাতেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দখলদারির মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তারকে সামনে আনে। একই সঙ্গে বোঝা যায়, সংঘাত তখন আর প্রচলিত সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া বা প্রতিরোধ গড়ে তোলাই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, রাজনৈতিক সমর্থন এবং যুদ্ধের পটভূমি সম্পর্কে বিশ্বজনমত গড়ে তোলাও প্রয়োজন ছিল।
অক্টোবরের পরিস্থিতি এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও প্রভাবশালী কয়েকটি রাষ্ট্র তাদের উদ্বেগকে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে রূপ দিতে আগ্রহী ছিল না।
ভারত, ওয়াশিংটন ও কূটনীতির হিসাব
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও রসদ দিয়ে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে ভারত প্রতিরোধযুদ্ধকে শক্তিশালী করে। একই সময়ে শরণার্থী সংকট ভারতের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি সংকটের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তাঁর অবস্থান ছিল, যেকোনো স্থায়ী সমাধানে বাঙালি জনগণের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং শরণার্থীদের নিরাপদে দেশে ফেরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এমন সম্ভাবনাও ভারতকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছিল।
ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল ভিন্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গোপন কূটনৈতিক উদ্যোগে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত নথিতে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংসতার উদ্বেগজনক খবর পাওয়ার পরও নিক্সন প্রশাসন ইসলামাবাদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই নীতির বিরোধিতা ছিল। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডসহ কয়েকজন কূটনীতিক ওয়াশিংটনের অবস্থানের প্রতিবাদ জানান। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাঠানো তাঁদের বিখ্যাত ভিন্নমতসংবলিত বার্তায় সামরিক দমন-পীড়নের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করা হয়। নিজ সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কূটনীতিকদের এমন অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।
ভারতের কৌশলগত অবস্থানও আগস্ট ১৯৭১-এ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তির ফলে নতুন মাত্রা পায়। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চুক্তি ভারতের কূটনৈতিক হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হয়ে ওঠে।
৩০ অক্টোবর নিক্সন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উভয় দেশের সেনা প্রত্যাহারের মতো ব্যবস্থার কথা এতে উঠে আসে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও চিঠিতে বলা হয়।
এই চিঠি থেকে বোঝা যায়, বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন ছিল। তবে সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পাকিস্তানের সঙ্গে তার ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
এদিকে, ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ধলাই সীমান্ত ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত চলে। এতে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বাহিনী সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি সংকটের ক্রমবর্ধমান সামরিক মাত্রা স্পষ্ট করে। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ক্রমেই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছিল।
কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছাড়াই অক্টোবর শেষ হয়। তবে সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি তখন দ্রুত বদলাচ্ছিল। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের চূড়ান্ত ঘটনাপ্রবাহের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল সেই সময়েই।
কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ অক্টোবর ১৯৭১
ইতিহাসের স্মৃতিতে সাধারণত কয়েকটি তারিখ বিশেষ গুরুত্ব পায়। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যামূলক অভিযান শুরুর দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। মাঝখানের দীর্ঘ সংগ্রামের সময়টিকে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় আনা হয়।
অথচ অক্টোবর ১৯৭১ দেখায়, কীভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক তৎপরতা এবং সাধারণ মানুষের অসাধারণ সহনশীলতার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে গিয়েছিল। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ওপর চাপ বজায় রেখেছিল। অস্থায়ী সরকার আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। ভারত বিপুল শরণার্থী সংকট সামলানোর পাশাপাশি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আর বৃহৎ শক্তিগুলোর অবস্থান দেখিয়ে দিয়েছিল, মানবিক বিপর্যয়ের মুখেও কৌশলগত স্বার্থ কীভাবে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে সীমিত করে দিতে পারে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসের প্রশংসা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেন তাদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছিল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে যুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল এবং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ভূমিকা কীভাবে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি।
এ জন্য শুধু স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মূল দলিল, যুদ্ধকালীন প্রতিবেদন, কূটনৈতিক চিঠিপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্বাধীন ঐতিহাসিক গবেষণার পাঠ। মুক্তিবাহিনীর সমকালীন সামরিক বুলেটিন সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করতে হবে। বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার বিবরণ প্রাপ্ত প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে রাখতে হবে কেন্দ্রে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যেসব শক্তি ভূমিকা রেখেছিল, সেগুলোকেও যথাযথভাবে বুঝতে হবে। এর মধ্যে ছিল মুক্তিবাহিনীর আত্মত্যাগ, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও প্রতিরোধ, স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ভারতের মানবিক ও সামরিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নীতি ও সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাধীনতাকে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা যাবে না। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে বিজয় নিশ্চিত ছিল না। সামরিক দমন-পীড়ন, বিপুল প্রাণহানি এবং কূটনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রতিকূলতার মুখে মানুষের দৃঢ়তা, সংগঠন এবং আত্মত্যাগই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের স্বয়ংক্রিয় কোনো পরিণতি ছিল না। তা অর্জিত হয়েছিল মানুষের সিদ্ধান্ত, সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং অসীম ত্যাগের মধ্য দিয়ে।
এই কারণেই অক্টোবর গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কারণেই ১৯৭১-এর বহু পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের জানা দরকার, বাংলাদেশ কীভাবে স্বাধীন হয়েছিল, সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে গিয়ে এ দেশের মানুষকে কী সহ্য করতে হয়েছিল।(দৈনিক কালের কন্ঠের সৌজন্যে)

