প্রান্তডেস্ক:মারণাস্ত্রের বদলে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে বিশ্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংঘাতের সমাধানে আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন তারেক রহমান। প্রায় ২১ মিনিটের বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন, নিরস্ত্রীকরণ এবং দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
তুমুল করতালির মধ্যে মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। কালো স্ট্রাইপ স্যুট ও লাল টাই পরা প্রধানমন্ত্রী বাংলায় তার বক্তব্য দেন। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
বিশ্বের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে স্থানান্তরের প্রবণতাকেও বিশ্বশান্তির জন্য অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে, সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ, এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি, সবার আগে বাংলাদেশ-সবার জন্য বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, জনগণকে ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে। দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘের এই মঞ্চে তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে আবেগাপ্লুত হন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে, এই মুহূর্তে, আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই, আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে, আজ আমিও, আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে, এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।
অতীতের রেওয়াজ বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষণ দেন বাংলায়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব, নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়তে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর কথাও বলেন।
ভাষণের শেষাংশে মুক্তিযোদ্ধা এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদেরও স্মরণ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এর আগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন।