সিলেটে গোলটেবিল বৈঠক : সিলেটে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

প্রান্তডেস্ক: দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় কম অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাকে সিলেট অঞ্চলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে বাড়তি উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা।
তারা বলেছেন, প্রবাসী পরিবারের শিশুদেরও পর্যাপ্ত পরিচর্যার ঘাটতি রয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজসেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার সিলেট শহরতলির বিমানবন্দর এলাকার গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ: পরিপ্রেক্ষিত সিলেট অঞ্চল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শিশুর বিকাশের সব দায়িত্ব সরকারের একার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ে শিশুদের খেলাধুলার জায়গা ও কর্নার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রাক্-প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সিলেটকে সাধারণত প্রবাসী-অধ্যুষিত ও সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে দেখা হলেও এখানে দারিদ্র্য রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম ও দরিদ্র এলাকায় শিশুদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা কঠিন।
এসব এলাকায় প্রকল্প নেওয়ার সময় স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, হাওর ও চা-বাগান এলাকায় শিশুসেবা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষায় হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় টিকাদান, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হয়।
চা-বাগান এলাকায় দারিদ্র্য, কম মজুরি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার সীমিত সুযোগও শিশুদের বিকাশে ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানান তিনি।
হাওরাঞ্চলে বোট ও স্যাটেলাইট ক্লিনিক চালু, দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টিকাদান এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের শিশুর বিকাশ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন উপাচার্য।
তিনি বলেন, গর্ভকাল থেকে শিশুর আট বছর বয়স পর্যন্ত শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, ভাষাগত, আবেগগত ও আচরণগত বিকাশের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রথম তিন বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, যৌথ পরিবার কমে যাওয়া, মা-বাবার দুজনের চাকরি এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে শিশুদের প্রয়োজনীয় সময় ও পরিচর্যা কমছে।
সিলেটের শিশুর পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য উল্লেখ করে জানান, সিলেটে ২ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের ৬৭ শতাংশ সঠিক বিকাশের পথে রয়েছে। জাতীয় হার ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার সিলেটে ১৩ শতাংশ, যা আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন। জাতীয় হার ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সিলেটে মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর বাড়িতে তিনটি বা তার বেশি বই রয়েছে। আর ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের খাদ্য দারিদ্র্যের হার ৭২ দশমিক ১ শতাংশ, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে জানান তিনি।
বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সমন্বয়কারী জেমস ওয়ার্ড খকশী বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করে বলেন, বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ বিষয়ে নীতিমালা হওয়ার পর চাহিদার দিকটি অনেকটা সংগঠিত হলেও সরবরাহের দিকটি এখনো পুরোপুরি সংগঠিত হয়নি।
তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী শিশুর জীবনের প্রথম তিন বছরে মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ শতাংশ বিকাশ হয়। অথচ প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে তিন বছর বয়সের পর আনুষ্ঠানিক শেখানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে শিশুর প্রাথমিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময় যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ কমে যায়।
বৈঠকে বক্তারা সিলেটে শিশুর বিকাশসংক্রান্ত একটি আঞ্চলিক তথ্যভান্ডার তৈরির আহ্বান জানিয়ে বলেন, সিলেটকে শুধু প্রবাসী-অধ্যুষিত বা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে দেখলে শিশুদের বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু এখনো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
সিলেটের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মাহমুদা সুলতানা শিশুবিষয়ক শহরকেন্দ্রিক উদ্যোগ তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগাঁওয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর অনেক পরিবারের আয়রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব পরিবারের শিশুদের খাবার ও মৌলিক চাহিদা পূরণই যেখানে কঠিন, সেখানে তাদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করাও কঠিন।
বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সমন্বয়কারী ফারাহ মুনীর বলেন, শিশুর বিকাশের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, যত্ন ও দিবাযত্নসেবার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
বিআইজিডি চার বছর ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, অংশীদারদের মাধ্যমে ৩০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলাধুলার মাধ্যমে শেখার মডেল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও শিশুদের সঙ্গে মা-বাবার কথা বলা, খেলা ও বই পড়ার উপকারিতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মাসুমা কাওসার, ব্র্যাক শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক আতাউর রহমান, সিলেট মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহিনা আক্তার, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আবদুর রফিকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
এছাড়া সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধান প্রণবকান্তি দেব, সিলেটের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা সাইদুর রহমান ভূঞা, সুনামগঞ্জের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা বাদল চন্দ্র বর্মণ, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন, সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রথম আলো সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

