তারুণ্যের স্পন্দন মুনির-তপন-জুয়েল
কবির য়াহমদ::১৯৮৮ সাল, সেপ্টেম্বর মাসের ২৪তম দিন। বাংলাদেশের উত্তর –পূর্ব সীমান্তের সিলেট শহরে তিন তরুণের রক্তে লাল হয়েছিল রাজপথ। প্রাণ বাঁচাতে দিকবিদিক ছুটে চলা তিনজনের কারও ঘাড়ে পড়েছিল ধারালো অস্ত্রের কোপ, কারও ওপর করা হয় নির্বিচার পাথরের আঘাত, আবার কেউবা অস্ত্রের কোপ থেকে বাঁচতে সুউচ্চ দালানের ছাদে ওঠে আরেক ছাদে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারায়। সেই তিন তরুণ, নাম মুনির-তপন-জুয়েল। পুরো নাম মুনির-ই-কিবরিয়া, তপন জ্যোতি দেব, আর এনামুল হক জুয়েল।
এবং ওটাই ছিল সিলেটের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। জামায়াত-শিবিরের হাতে সেদিন আক্রান্ত হয় জাসদ ছাত্রলীগ, সূচিত হয় সিলেটের হত্যার রাজনীতির; এবং সে ধারা এখনও বহমান, কখনও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা আবার কখনও নিজ সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে।
অতঃপর দুই দশকের বেশি সময় পর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পরিচয় না থানা সিলেটের সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে উচ্চারিত তারুণ্য ফের প্রচারের আলোয় এনেছে বিস্মৃতপ্রায় সেই তরুণদের। গত কয়েক বছর ধরে স্মরণ করা হচ্ছে মুনির-তপন আর জুয়েলকে, আলোর মিছিলের মাধ্যমে, এবং সেটা করছে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধি মোর্চার ব্যানারে।
কী ঘটেছিল সে দিন প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮; সকালেই সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাস দখল হয়ে যায়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাস দখল করে শহরের চৌহাট্টাস্থ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে এমসি কলেজ পর্যন্ত সশস্ত্র মহড়া দিতে থাকে মোটর সাইকেল ও টেম্পো সহযোগে।
সে সময় তারা মুনিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে চলে যায়। তপনকে ধরে মধ্যযুগীয় কায়দায় পাথর দিয়ে তার শরীর থেঁতলে দেয়। মুনির-তপন দুইজনকে আহত করে শিবির ক্যাডাররা ফেলে চলে গেলে এলাকাবাসী তাদেরকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে সেখানেই তাদের মৃত্যু হয়।একই দিন শহরের শিবিরের এক মিছিল থেকে স্কুল ছাত্র জুয়েলকে ধাওয়া করে শিবির ক্যাডাররা। শিবিরের ধাওয়া খেয়ে জুয়েল দৌড়ে একটা মার্কেটের ছাদে ওঠে যায়। ছাত্র শিবিরের সন্ত্রাসীরা ছাদে ওঠেও ধাওয়া করে জুয়েলকে। এক পর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে যেতে লাফ দেয় সে, পারেনি; ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
জুয়েল স্কুলছাত্র হলেও শিবিরের স্কুল রাজনৈতিক প্রচারণার বিপক্ষে অবস্থানে নেওয়ার কারণে তাকে আক্রমণ করা হয়। একই দিন এ তিন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সিলেট শহরে ঘৃণ্য ছাত্র হত্যার রাজনীতি শুরু হয়।
শহীদ মুনির-তপন-জুয়েল রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক দিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সত্য কিন্তু তাদের চেতনা ছিল অবিনশ্বর একটি চেতনা যা অসাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করত। স্বভাবত সেখানেই তাদের বিরোধ ছিল মৌলবাদী, ধর্মান্ধ জামায়াত-শিবিরগোষ্ঠীর সাথে।

