১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর হুনান প্রদেশের শাওশানে মাওয়ের জন্ম। তিনি এমন এক সময় বড় হয়ে উঠছিলেন, যখন চীন গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্য চীনা সমাজে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল। তরুণ মাওও সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় ধীরে ধীরে রাজনীতি ও বিপ্লবী চিন্তার দিকে আকৃষ্ট হন।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশে বিশ শতকের প্রথম দিকের চীনের জাতীয়তাবাদী ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯১৯-২০ সালের নতুন সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের সময় তিনি আরও সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে মার্কসবাদ তাঁর চিন্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার পর মাও ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল চীনের বাস্তবতার সঙ্গে মার্কসবাদকে যুক্ত করার চেষ্টা। ইউরোপের শিল্পশ্রমিকনির্ভর বিপ্লবের ধারণার বদলে তিনি চীনের বিপুল কৃষক জনগোষ্ঠীকে বিপ্লবী সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। এখান থেকেই পরবর্তীকালে মাওবাদী রাজনৈতিক চিন্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো বিকশিত হয়।
মাওয়ের নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল চীনা গৃহযু*দ্ধ। দীর্ঘ সা*মরিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্টরা নিজেদের শক্তি সংগঠিত করে। এই সময়ে মাও শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, সা*মরিক কৌশলবিদ হিসেবেও নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবী আন্দোলনের ওপর প্রভাব ফেলে।
১৯৪৯ সাল মাওয়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। চীনা কমিউনিস্টদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর মাও দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও তাঁর কর্তৃত্ব বজায় ছিল।
মাওয়ের রাজনৈতিক দর্শন শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাম*রিক চিন্তার সমন্বয় পরবর্তীকালে ‘মা*ওবাদ’ নামে পরিচিত হয়। কৃষককে বিপ্লবের শক্তি হিসেবে বিবেচনা, দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রাম, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাম*রিক কৌশলের সমন্বয়—এসব তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
তবে মাওয়ের উত্তরাধিকারকে শুধু বিপ্লবী সাফল্যের মধ্য দিয়ে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। তাঁর নেতৃত্বে চীন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। একই সঙ্গে তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন রাজনৈতিক অভিযান ও নীতির প্রভাব নিয়ে ইতিহাসে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ফলে মাওকে নিয়ে আলোচনা একই সঙ্গে বিপ্লব, রাষ্ট্রগঠন, সমাজ পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে আলোচনাও।
মাও ছিলেন অসাধারণ রাজনৈতিক সংগঠক। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি বিপ্লবী সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে যাওয়া তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার বড় প্রমাণ। তাঁর লেখালেখি ও রাজনৈতিক বক্তব্যও পরবর্তী প্রজন্মের বিপ্লবীদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা*ওবাদী আন্দোলনের উত্থান তাঁর চিন্তার আন্তর্জাতিক প্রভাবেরই একটি উদাহরণ।
ব্যক্তিজীবনেও মাও ছিলেন আলোচিত ও বহুমাত্রিক চরিত্র। তাঁর জীবনে একাধিক বিবাহ হয়েছিল এবং তাঁর দশ সন্তান ছিল বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ আছে। তিনি নিজেকে ধর্মহীন হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং পেশাগতভাবে বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে ৮২ বছর বয়সে মাও সে তুংয়ের মৃ*ত্যু হয়। তাঁকে বেইজিংয়ের চেয়ারম্যান মাও মেমোরিয়াল হলে সমাহিত করা হয়েছে।
তার প্রয়াণের দিনে আমাদের শ্রদ্ধা।


