বেজিংয়ে ডোভাল: সীমান্তে শান্তি ফেরাতে জোর দিচ্ছে ভারত ও চীন

প্রান্তডেস্ক::বেজিং থেকে কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট – সীমান্তে সংঘাত নয়, আপাতত স্থিতিশীলতাই ভারত ও চিনের অগ্রাধিকার। কিন্তু এই শান্তির আবহের নেপথ্যেই রয়েছে একাধিক অমীমাংসিত প্রশ্ন, অরুণাচল নিয়ে নতুন উত্তেজনা এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে গভীর কৌশলগত অবিশ্বাস।
সীমান্ত বিবাদ মেটানোর লক্ষ্যে চিন সফরে গিয়ে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বেজিংয়ে চিনের উপরাষ্ট্রপতি হান ঝেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। এরপরই চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে শুরু হয় ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ে ২৫তম দফার বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক।
এই বৈঠককে নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছে না আন্তর্জাতিক মহল। কারণ, প্রায় ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-চিন সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ এখনও পুরোপুরি মেটেনি। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর শান্তি বজায় রাখা, সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং সীমান্ত সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোঁজাই এবারের আলোচনার মূল লক্ষ্য।
২০০৩ সালে ভারত ও চিনের মধ্যে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছিল। ভারতের হয়ে এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন অজিত ডোভাল এবং চিনের পক্ষে রয়েছেন ওয়াং ই। ফলে তাদের বৈঠক শুধু সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতের ভারত-চিন সম্পর্কের দিকনির্দেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকের আগে চিনের উপরাষ্ট্রপতি হান ঝেং যে বার্তা দিয়েছেন, তাতেও কূটনৈতিক হিসাব স্পষ্ট। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, মতপার্থক্য কমানো এবং সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর কথা।
ডোভালের বক্তব্যেও ছিল একই সঙ্গে সহযোগিতা এবং সতর্কতার সুর। বিশ্বের দুই বৃহৎ ও দ্রুত বিকাশশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারত ও চিনের সামনে সহযোগিতার ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে সেই সহযোগিতার পূর্বশর্ত হিসেবে সীমান্ত সমস্যার উপযুক্ত সমাধান এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
অর্থাৎ, দিল্লির বার্তা হল – সীমান্তে স্থিতিশীলতা ছাড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণ সম্ভব নয়।
আর এখানেই রয়েছে এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
একদিকে বেজিং থেকে আস্থা ও সহযোগিতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে চিনের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় চিনের আগ্রাসন নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ এবং এলএসি-সংলগ্ন চিন অধিকৃত তিব্বতের একাধিক এলাকার নাম পরিবর্তন করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ – দুই ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে কূটনৈতিক টেবিলে শান্তির ভাষা থাকলেও সীমান্তের বাস্তব রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা এখনও তীব্র।
বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চিনের ধারাবাহিক দাবিকে ভারত বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে সীমান্তে শান্তির আলোচনা চলার পাশাপাশি ভূখণ্ডগত অবস্থান শক্ত করার যে প্রবণতা দুই পক্ষের মধ্যেই রয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এই পরিস্থিতিতে ডোভালের বেজিং সফরের আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক রয়েছে – আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে। ফলে ডোভাল-ওয়াং আলোচনা কার্যত সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিপর্ব হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার কাজানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর ভারত-চিন সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছিল। সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার এবং উত্তেজনা কমানোর কিছু পদক্ষেপের পর দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগও ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়েছে।
কিন্তু সম্পর্কের এই ‘স্বাভাবিকীকরণ’ কতটা গভীর এবং কতটা কৌশলগত – সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ ভারত চাইছে সীমান্তে স্থায়ী শান্তি এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি। চিনও ভারতের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী হতে পারে। কিন্তু অরুণাচল, এলএসি এবং সীমান্তে পরিকাঠামোগত ও সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দুই দেশের অবিশ্বাস এখনও যথেষ্ট গভীর।
তাই ডোভাল-ওয়াং বৈঠক থেকে যদি কোনও ইতিবাচক ফল আসে, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সীমান্তের মাটিতে।
কূটনৈতিক টেবিলে শান্তির ভাষা যতই জোরালো হোক, ভারত-চিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এলএসি-তে বাস্তব পরিস্থিতি, অরুণাচল নিয়ে অবস্থান এবং পারস্পরিক আস্থার পরীক্ষায়।
এই মুহূর্তে তাই ডোভালের বেজিং সফরকে শুধু সীমান্ত বৈঠক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে ভারত-চিন সম্পর্কের পুনঃসমন্বয়, সম্ভাব্য মোদি-শি যোগাযোগের প্রস্তুতি এবং সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমীকরণ নতুন করে নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পর্ব।

