দোয়ারা বাজারেবাবাকে হত্যায় সৌদি থেকে টাকা পাঠান ছেলে, খুনি ভাড়া করেন পুত্রবধূ

প্রান্তডেস্ক:সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে জমিজমা লিখে না দেওয়ার জেরে এক বৃদ্ধকে ৫০ হাজার টাকায় চুক্তি করে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার পুত্রবধূর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ওই পুত্রবধূ হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নিহতের পুত্রবধূ ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হোসনা বেগম (৩৮), খাইরুল ইসলামের ছেলে রুহুল আমিন (২২) এবং মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে নজরুল ইসলাম (২০)।
পুত্রবধূর বরাত দিয়ে থানা–পুলিশ জানায়, জমিজমা লিখে দেওয়ার জন্য বৃদ্ধ বাবাকে চাপ দিচ্ছিলেন ছেলে ও ছেলের বউ। কিন্তু বৃদ্ধ রাজি হননি। এতে ক্ষুব্ধ ছিলেন দুজন। একপর্যায়ে বাবাকে হত্যার জন্য প্রবাস থেকে টাকা পাঠান ছেলে। আর ছেলের বউ ভাড়া করেন খুনি। হত্যার পর স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দোয়ারাবাজার থানার ২ নম্বর নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে গত ১৪ আগস্ট রাত ১২টার দিকে নিজ শয়নকক্ষে মোহাম্মদ আলী (৭৫) নামের ওই বৃদ্ধকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের নাতনি মোছা. আছমা বেগম (২৬) বাদী হয়ে দোয়ারাবাজার থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে একটি লিখিত এজাহার করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীর একমাত্র ছেলে ইসমাইল হোসেন সৌদি আরবে থাকেন। বাড়িতে থাকেন মোহাম্মদ আলী, ইসমাইলের স্ত্রী হোসনা বেগম ও ওই দম্পতির এক ছেলে। শনিবার সকালে গ্রামে খবর রটে, মোহাম্মদ আলী ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন। হোসনা বেগমই সেটি প্রচার করেন। এরপর স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে লাশ দাফনের উদ্যাগ নেন স্থানীয় লোকজন।
দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, শনিবার দুপুরে ওই গ্রামের এক ব্যক্তি থানায় এসে তাকে মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর খবর দেন এবং লাশের গলায় দাগ ও মুখে রক্ত আছে বলে জানান। এরপর তিনি ফোনে লাশ দাফন বন্ধ রাখতে বলে ওই গ্রামে যান। সেখানে গিয়ে তাঁর সন্দেহ হলে তিনি লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠান। লাশের সঙ্গে থানায় এসেছিলেন মোহাম্মদ আলীর পুত্রবধূ হোসনা বেগম।
ওসি রাতে হোসনা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে হোসনা হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং তিনিই হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের ভাড়া করেন বলে জানান। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ রোববার অভিযান চালিয়ে অন্য দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আলীর এক নাতনি (ইসমাইলের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে) আছমা বেগম বাদী হয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
হোসনা বেগমের বরাত দিয়ে ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, জমি লিখে না দেওয়ায় ইসমাইল ও হোসনা বেগম মোহাম্মদ আলীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর জেরে কিছুদিন থেকে মোহাম্মদ আলী আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ নিয়ে আরও বিরক্ত হন ইসমাইল। এরপর হোসনা তাঁর আত্মীয় রুহুলকে ডেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরে রুহুল যোগাযোগ করেন ইসমাইলের সঙ্গে। ইসমাইল বাবাকে হত্যার সম্মতি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা পাঠান। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে রুহুল আমিন, নজরুল ইসলাম ও একই গ্রামের জিয়াউর রহমান ওই বাড়িতে আসেন। তখন ঘরের দরজা খুলে দেন হোসনা বেগম। এই তিনজন হোসনার কক্ষ থেকে একটি মই দিয়ে মোহাম্মদ আলীর কক্ষে যান। তিনি তখন ঘুমে ছিলেন। তাঁরা ঘুমন্ত মোহাম্মদআলীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তখন হোসনা ওপর থেকে বাতি দেখিয়ে তাঁদের সহযোগিতা করেন। কাজ শেষে ওই তিনজন চলে যান। এরপর হোসনা ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে ঘুম থেকে ওঠে তিনি আশপাশের লোকজনকে জানান, তাঁর শ্বশুর দরজা খুলছেন না। পরে লোকজন ঘরে ঢুকে দেখেন, বিছানায় তাঁর মরদেহ পড়ে আছে।
ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, গ্রেপ্তার হোসনা বেগমসহ তিনজন মোহাম্মদ আলীকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।

