ইসরায়েলি হামলায় পরিবারহারা গাজার ৬০ হাজার শিশু

প্রান্তডেস্ক:ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর গাজা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়েছে। যুদ্ধের জেরে প্রায় ৬০ হাজার শিশু তাদের পরিবারকে হারিয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি উন্নয়ন সংস্থা তাওয়ুন।
সংস্থাটির দাবি, এটি গাজার মোট শিশুর প্রায় ৬ শতাংশ, যা এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।
দ্য নিউ আরব কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাওয়ুনের মহাপরিচালক ড. তারেক এমতাইরাহ বলেছেন, আগের প্রতিটি সংঘাতের পরই অনাথ শিশুদের নিয়ে কাজ করেছে তাদের সংস্থা। কিন্তু এবারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রচলিত সহায়তা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তাওয়ুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যুদ্ধাহত ও অনাথ শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানসিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ২৫০ ছাড়িয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ২০ লক্ষ বাসিন্দার অধিকাংশই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
স্কুল, হাসপাতাল, নার্সারি এবং শিশুদের সহায়ক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অনাথ হওয়া মানে শুধু বাবা মাকেই হারানো নয়। শৈশবের পুরো নিরাপত্তা বলয় হারিয়ে ফেলা।
ড. এমতাইরাহ জানান, বহু পরিবার এখন শুধুমাত্র মায়ের ওপর নির্ভরশীল। বিধবা মা বা নারী আত্মীয়রা বোমাবর্ষণ, খাদ্যসংকট ও বারবার স্থানচ্যুতির মধ্যেও শিশুদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু এখনও প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে তাওয়ুন প্রায় ২১ হাজার অনাথ শিশুর দায়িত্বে থাকলেও সংকটের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেইসব শিশুদের নিয়ে, যারা হামলায় আহত হলেও পরিবারের কেউ জীবিত নেই।অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া গেলেও আইনগত অভিভাবক না থাকায় প্রয়োজনীয় নথিতে স্বাক্ষর করার কেউ নেই। ফলে তারা মানবিক সংকটের পাশাপাশি আইনি অনিশ্চয়তারও শিকার হচ্ছে ক্রমশ।
শিক্ষাব্যবস্থার ধস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অধিকাংশ স্কুল ধ্বংস হয়েছে বা আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাই তাওয়ুন ও সহযোগী সংস্থাগুলি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলছে। যেখানে শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে অনেক শিশুর খোঁজ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ড. এমতাইরাহ বলেন, বর্তমান সহায়তা কার্যক্রম বিচ্ছিন্ন ও সমন্বয়হীন। তাই প্রতিটি অনাথ শিশুর তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং কার্যকর সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে তাওয়ুন।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে , যুদ্ধের মানসিক ক্ষত দীর্ঘদিন বহন করতে হবে এই শিশুদের। ভয়, ট্রমা, বাক্প্রতিবন্ধকতা এবং অল্প বয়সেই ছোট ভাইবোনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তাদের স্বাভাবিক শৈশব কেড়ে নিচ্ছে।
এই কারণেই তাওয়ুন নতুন ‘গাজা ৩৬০ কেয়ার মডেল’ চালু করেছে। যেখানে খাদ্য ও আশ্রয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানসিক পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু মানবিক সহায়তার প্রকল্প নয়। গাজার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তথ্যসূত্র দ্য নিউ আরব।

