সিকিমে দেখা মিলল ‘হবেকি?’–এর নতুন গ্রাফিতির

ছবি: সংগৃহীত
প্রান্তডেস্ক:দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার দেয়ালে রহস্যময় বার্তাধর্মী গ্রাফিতি এঁকে আলোচনায় থাকা ‘হবেকি?’ সিরিজের সর্বশেষ শিল্পকর্ম এবার দেখা গেছে ভারতের সিকিমে। গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাঝিতার নালা ব্রিজের একটি কংক্রিটের দেয়ালে আঁকা এই নতুন গ্রাফিতি ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিল্পপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
জুন মাসের শেষ দিনে আঁকা প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ এই গ্রাফিতিতে স্প্রে পেইন্ট ও স্টেনসিল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। চিত্রকর্মের শেষ প্রান্তে শিল্পীর পরিচিত সিগনেচার ট্যাগ ‘হবেকি?’ দেখা যায়।
নতুন গ্রাফিতিতে ‘সুবোধ’ চরিত্রকে এলোমেলো লম্বা চুল ও পায়ে জুতা পরা অবস্থায় একটি ঝুলন্ত হ্যামকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। হ্যামকের দুই প্রান্ত বাঁধা রয়েছে কাঁটাতারের সঙ্গে। সুবোধের এক হাতে রয়েছে একটি তার কাটার (ওয়্যার কাটার), অন্য হাতটি ঝুলে আছে হ্যামকের বাইরে। তার নিচে রাখা রয়েছে একটি বালতি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরেই মাঝিতার নালা ব্রিজ এলাকায় গ্রাফিতিটি দেখা যাচ্ছে।
শিল্পকর্মটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এলো, যখন কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভারত থেকে ফেরত পাঠানো নিয়ে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা চলছে। একই সঙ্গে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যটক ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছে ভারত।
‘হবেকি?’ সিরিজের শিল্পকর্মের নথিভুক্তকরণে কাজ করা প্রতিষ্ঠান আর্টকন–এর প্রতিষ্ঠাতা এআরকে রিপন জানান, নতুন এই গ্রাফিতির স্থান নির্বাচন ও ভাবনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, কাঁটাতারের বেড়া, তার কাটার যন্ত্র এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টন এসব বিষয় প্রতীকীভাবে উঠে এসেছে।
তার ভাষায়, রংপো শহর সিকিমের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। গ্যাংটকের পথে এটিই অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ, যেখানে যাতায়াত, পরিচয় যাচাই ও অনুমতির বিষয়গুলো দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ। ফলে এই অবস্থান গ্রাফিতিটিকে শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং একটি ‘সীমান্ত-ঘটনা’র প্রতীকে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘হবেকি?’ নামের আড়ালে আঁকা ‘সুবোধ’ সিরিজের গ্রাফিতিগুলো সমাজ, রাজনীতি ও মানবাধিকারসংক্রান্ত নানা বার্তার জন্য ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। স্টেনসিলের মাধ্যমে আঁকা এসব শিল্পকর্মের প্রতিটিতেই থাকে প্রতীকী ভাষা ও সামাজিক বার্তা।
রহস্যময় এই শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় এখনো অজানা। তিনি কখনো প্রকাশ্যে আসেননি কিংবা নিজের কোনো কাজের মালিকানাও দাবি করেননি।
যদিও ‘সুবোধ’ সিরিজের সূচনার নির্দিষ্ট সময় জানা যায়নি, তবে ২০১৭ সালের দিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্রাফিতিগুলো ব্যাপক আলোচনায় আসে। সে সময় শিল্পীর পরিচয় জানার চেষ্টা করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও।
এই সিরিজের আলোচিত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না’, ‘সুবোধ, কবে হবে ভোর?’, ‘সুবোধ এখন জেলে! পাপবোধ নিশ্চিন্তে করছে বাস মানুষের হৃদয়ে’, ‘সুবোধ তুই ঘুরে দাঁড়া’ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আঁকা ‘দিস ইজ মাই মাস্টারপিস’।
সবশেষ ঢাকার আগারগাঁও-মহাখালী লিংক সড়কে আঁকা গ্রাফিতিতে দেখা যায়, সুবোধ হাঁটু গেড়ে এক শিশুকে আলিঙ্গন করছেন। শিশুটির মাথায় সৈনিকের হেলমেট এবং হাতে বাংলাদেশের ছোট একটি পতাকা। অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চে চট্টগ্রামের সিআরবি হিলে আঁকা আরেকটি গ্রাফিতিতে একটি গাধার পিঠে ভাস্কর্যের মতো বসে থাকা এক ব্যক্তির চিত্র ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশে ‘সুবোধ’ সিরিজের জনপ্রিয়তা অনেক শিল্পীকেই অনুপ্রাণিত করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বহু শিল্পী ‘হবেকি?’–এর শৈলী অনুসরণ করে গ্রাফিতি এঁকেছেন। এমনকি বাংলাদেশের ব্যান্ড ইন্দালো এই রহস্যময় শিল্পীকে নিয়ে গানও তৈরি করেছে।
‘হবেকি গ্রাফিতি ফ্যানস’ নামের একটি ফেসবুকভিত্তিক কমিউনিটির তথ্য অনুযায়ী, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুই ‘সুবোধ’ সিরিজের মূল উপজীব্য।
অনেক শিল্পসমালোচক ‘হবেকি?’–এর কাজের সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় স্ট্রিট আর্টিস্ট ব্যাঙ্কসি–র মিল খুঁজে পান। ব্যাঙ্কসির মতোই ‘হবেকি?’ও স্টেনসিল ব্যবহার করেন এবং ছদ্মনামের আড়ালে নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন। দুই শিল্পীর পরিচয়ই এখনো রহস্যে ঘেরা।

