ছয় দফা আন্দোলন ও শহীদ মনু মিয়া

ছবি : সংগৃহীত
‘মামুন রশীদ::সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ ছয় দফাকে এভাবেই মূল্যায়ন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বস্তুত ছয় দফার ভেতরেই সুপ্ত ছিল বাঙালির স্বাধীনতার বীজ। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলগুলো আহূত কনভেনশনে সাবজেক্ট কমিটির সভায় উত্থাপন করেন ‘ছয় দফা’। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি লাহোর থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ছয় দফার বিস্তারিত জানান। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি ‘ছয় দফা’কে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করায় বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ছয় দফার পক্ষে প্রচারণা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা প্রসঙ্গে প্রথম সফরে ১৯৬৬-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় ‘ছয় দফা’কে ‘নূতন দিগন্তের নূতন মুক্তিসনদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর মাইজদী ও বেগমগঞ্জ, ১০ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, ১১ মার্চ ময়মনসিংহ সদর এবং ১৪ মার্চ সিলেটে অনুষ্ঠিত জনসভায় ছয় দফার পক্ষে বক্তব্য দেন। ‘ছয় দফা’ প্রচার ও প্রকাশের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত হয় ছয় সদস্যের ‘উপকমিটি’। ‘আমাদের বাঁচার দাবী : ছয় দফা কর্মসূচী’ শীর্ষক একটি পুস্তিকাও মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়।
বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রচারণায় দেশব্যাপী ‘ছয় দফা’র পক্ষে জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। বিপরীতে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ওপর নেমে আসে স্বৈরশাসক আইয়ুবের গ্রেপ্তার-নির্যাতন। ১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় শ্রমিক-জনতার সমাবেশে বক্তৃতা করে রাতে ঢাকায় ফেরার পরেই পুলিশ দেশরক্ষা আইনের ৩২/১ ধারাবলে বঙ্গবন্ধুকে আটক করে। প্রতিবাদে সারা দেশে ১৩ মে পালিত হয় প্রতিবাদ দিবস এবং ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ৭ জুনের হরতালে বিক্ষুব্ধ মানুষ স্বাধিকার ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়। এদিন পুলিশের গুলিতে তেজগাঁওয়ে শহীদ হন মনু মিয়া। ছয় দফা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ফখরুদ দৌলা, তিনি পরিচিত মনু মিয়া নামে। জন্ম সিলেটের বিয়ানীবাজারের বড়দেশ গ্রামে। বাবা মনোহর আলী খান, মা রমজান বিবি। বাবা-মায়ের ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের মাঝে মনু মিয়া ছিলেন দ্বিতীয়। অভাবের কারণে প্রাথমিকের পর পড়ালেখা এগোয়নি। কুড়ি-বাইশ বছর বয়সে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে গাড়ি চালানো শিখে কাজ নেন একটি কোমলপানীয় প্রস্তুতকারী কোম্পানিতে।
স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ‘৭ জুন : মনু মিয়ার আত্মত্যাগ ও ৬ দফা দিবস’ শিরোনামে এক লেখায় লিখেছেন, ‘আমরা তখন মনু মিয়াকে চিনতাম না। ৭ জুন ভোর থেকে শত চেষ্টা করেও একটা কার্যকর মিছিল বের করা সম্ভব হয়নি। যেটুকু হয়েছিল সেটাকে ঝটিকা মিছিল বলাই বাঞ্ছনীয়। প্রকাশ্যে মিছিল করতে ব্যর্থ হয়ে আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা ৭ই জুন সকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী এক্সপ্রেস ট্রেনটির গতি রোধ করে দেব। … আমাদের কাছাকাছি এসে পুলিশভর্তি ইঞ্জিনটি থেকে একজন গুলি ছুড়ে (সেদিন নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাটেও গুলি হয়েছিল)। যে দুজনের ঘাড়ে ভর দিয়ে আমি বক্তৃতা করছিলাম তাদের একজন মাটিতে পড়ে গেলেন; তিনিই মনু মিয়া। তাঁকে সাথে সাথে তেজগাঁর একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। তখনও তিনি জীবিত এবং জ্ঞান রয়েছে। বিন্দুমাত্র চিকিৎসা তাঁর শুরু হয়নি, আমার কোলে মাথা রেখে মনু মিয়া বিড়বিড় করে বললেন, “মুজিব ভাইর সাথে দেখা হলে বলবেন, আমি ৬ দফার জন্য জীবন দিয়ে গেলাম।” এ লেখাতেই তিনি আরও বলেন, ‘মুজিব ভাই (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “মনু মিয়া আমার আলমের কাছে বলে গেছে, সে ৬ দফার জন্য রক্ত দিয়ে গেছে, বাংলার মুক্তির জন্য রক্ত দিয়ে গেছে। আমি এই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে গেলামÑ তার রক্তের সঙ্গে শেখ মুজিব কখনো বেঈমানী করবে না।”
আনুমানিক ত্রিশ বছর বয়সের মনু মিয়ার মৃত্যু আন্দোলনের গতি পাল্টে দেয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার শহীদ মনু মিয়ার স্মৃতিতে রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও নাখালপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করে ‘মনু মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়’। ছয় দফার প্রথম শহীদ মনু মিয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।

