বাংলা সন : উৎপত্তি, বিবর্তন ও কিছু কথা
-6739c83e4fdb9.jpg)
আসাদুল্লাহ :: আকবরের বৈশাখ নাকি শশাঙ্কের অগ্রহায়ণ! শকাব্দ নাকি বঙ্গাব্দ? বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক যাত্রার অভিমুখ হবে কোন দিকে? ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অনুশীলন আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়? এখানে তর্ক বিতর্ক আর বর্ণনার ডামাডোলে হারিয়ে হাওয়া ইতিহাসের সেই নবান্ন আর অগ্রহায়ণকে একটু খোঁজ করা যাক। আমরা তো জানি যে সৌর বছরের হিসেবে আমাদের যে দিনপঞ্জি সেখানে সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর একবারের আবর্তন সম্পন্ন করার সময় থেকে খুঁজে নেওয়া হয় আধুনিক বছরকে। অন্যদিকে কেউ কেউ দিনপঞ্জি তৈরি করেন চান্দ্র বছরের বাস্তবতায়। ওদিকে দিনপঞ্জির এই বাস্তবতায় নিঃসন্দেহে বদলে যায় বছরের প্রথম মাস তথা নববর্ষের দিনও।
আকবরের চাপিয়ে দেওয়া খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তৈরি সেই পহেলা বৈশাখি নববর্ষের আগেও বাংলার মানুষের নববর্ষ ছিল। মরা কার্তিকের পর তাদের জীবনে নবান্নের নামান্তে আনন্দের জোয়ার নিয়ে হাজির হতো অগ্রহায়ণ। মানুষ কীভাবে এই সময় নির্ধারণ করেছিল তখন? প্রশ্ন উঠতে পারে চাঁদ কিংবা সূর্যের হিসেবে প্রচলিত মাসগুলোর ধারণা যখন তাদের ছিলোই না। তারা কীভাবে তৈরি করেছিল তাদের এই বছরের হিসেব? বাস্তবতা হচ্ছে চন্দ্র-সূর্যের গতি লক্ষ করার আধুনিক বিজ্ঞান কিংবা ধারণা বাংলার মানুষের প্রয়োজনই হয় বছরের বারোটা মাসকে আলাদা ভাগ করে নিতে। তারা প্রকৃতি প্রতিবেশ আর ফসলের উপর নির্ভরশীল জীবনে বছরের বারোমাসের নাম দিয়েছিল বিভিন্ন নক্ষত্রের নামে। তখন কোন মাসের নাম কীভাবে কিংবা কেনো দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে বক্তব্য থাকতে পারে। তবে বছরের প্রথম মাস কীভাবে অগ্রহায়ণ না নিয়ে আলোচনার অবতারণা করা যেতে পারে ঠিক এভাবে।
শব্দের উৎপত্তি তথা ব্যুৎপত্তি থেকে দেখতে গেলে বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হিসেবে ‘অগ্রহায়ণ’ নামটাতেই রয়েছে বড় প্রমাণ। কারণ সেখানে ‘অগ্র’ শব্দের মানে আগের তথা প্রারম্ভিক। আর ‘হায়ণ’ মানে বছর। অর্থাৎ ‘হায়ণ’ বা বছরের প্রারম্ভে তথা ঠিক শুরুতেই যেই মাস সেটার নাম দেওয়া হয়েছিল অগ্রহায়ণ। কবি জীবনানন্দের সেই মরা কার্তিকের পর নবান্নের পয়গাম নিয়ে হাজির হওয়া এই অগ্রহায়ণেই ছিল বর্ষবরণের আমেজ। তখনকার দিনে নতুন ধান থেকে তৈরি চালের পিঠা-পুলি আর ভাত খেয়ে সবাই শুরু করতো নতুন বছরের দিন গোনা। আর সেখানে কৃষিপ্রধান দেশের বর্ষবরণ হতো পুরোপুরি কৃষিকেন্দ্রিক।
কৃষি ইতিহাসের গবেষকগণ আরও ভালো বলতে পারবেন। প্রত্নতাত্ত্বিক সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহসান ধান ও চালের এই বিবর্তনকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপনে। তিনি বলেছিলেন দুটি বিশেষ ধরনের ধান-চালে আবর্তিত হতো তখনকার দিনের বাংলার মানুষের খাদ্যচক্র। আশু তথা আউশ আর আমন। আর আশু কিংবা আউশকে একপাশে রাখলে বাংলার মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য তথা ধান হিসেবে আমনকে রাখা হতো তালিকার সবার উপরে। আর সে হিসেবে আমন ধান ওঠার পর তাকে কেন্দ্র করে পালিত হতো নবান্ন উৎসব। এই নবন্নের সঙ্গে নববর্ষ যুক্ত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। আনুষঙ্গিক আলোচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক সৈয়দ কামরুল আহসান আরও বলেছিলেন তখনকার দিনে ধানের পাশাপাশি খড় এবং ধানগাছের নাড়াও ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই খড় খাওয়াতে হতো গরুর মতো গবাবি পশুকে আর উচ্ছিষ্টাংশ তথা নাড়া দিয়ে চলতো গ্রামের মানুষের জ্বালানির কাজ।
গ্রামীণ শৈশবের সঙ্গে আপনারা কেউ কেউ নিজেকে একটু মিলিয়ে নেবেন !! এই ধানগাছের নাড়া দিয়ে গর্তের মধ্যে আগুন লাগিয়ে কলাগাছের খোল দিয়ে তৈরি পাইপে ধোঁয়া বের করার গল্পটা তাদের জানা থাকার কথা। শৈশবে ‘ইটভাঁটা খেলা’ নামে পরিচিত সেই খেলার সঙ্গেও মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি একটা মহাগুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যাই হোক চণ্ডীমঙ্গলের কবি মুকুন্দ চক্রবর্তী এই মাস সামনে রেখেই বলেছিলেন-
‘ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস।
বিফল জনম তার, নাই যার চাষ।’
তিনি বোঝাতে চেয়েছে মানুষের খেয়ে পরে বাঁচবনার জন্য অগ্রহায়ণ কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের জীবনে। ওদিকে খনার বচনেও জানা গিয়েছে অগ্রহায়ণ বন্দনা। খনা বলছেন ‘যদি বর্ষে আঘনে। রাজা যান মাগনে।’ আমরা যদি তার বক্তব্যে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি তা অর্থ দাঁড়ায় ‘অগ্রহায়ণ মাসে বৃষ্টি পড়লে রাজাকে ঋণের মধ্যে পড়তে হয়’। কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে অগ্রহায়ণের ধান কাটা মৌসুমের বৃষ্টি ফসলকে নষ্ট করে দেয়। আর নতুন ফসল তোলার কালের রোদ ঝলমলে আকাশ তৃপ্তির হাসি নিয়ে আসে কৃষকের মুখে। কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে বাংলার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। তাই নতুন ফসল তোলার মাসটাই তাদের কাছে শ্রেষ্ঠ তথা গুরুত্বপূর্ণ মাস হিসেবে বিবেচিত হবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। আর হয়তো এ কারণেই মাছ, ধান আর কৃষির দেশ বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরে নিয়েছিল অগ্রহায়ণকেই। সে হিসেবে বছরের প্রথম দিন ছিল নবান্ন। আর এই নবান্ন ও নববর্ষ মিলে মিশে একাকার হয়েছিল অভিন্ন সাংস্কৃতিক স্রোতধারায়।
ওপার কিংবা এপার বাংলায় সাংস্কৃতিক বাস্তবতা থেকে ধর্মীয় অবস্থান আর জোরাজুরি হয়ে গিয়েছে বর্ষবরণের মূল প্রতিপাদ্য। এখানে ইতিহাসের তথ্য, সাংস্কৃতিক উদ্যাপন আর বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গিয়েছে ‘পহেলা বৈশাখ’ কিংবা ‘পহেলা অগ্রহায়ণের’ উদ্যাপনের পাদপীঠ। বাংলা সন তথা এই চিরচেনা ‘বঙ্গাব্দ’ এটার প্রবর্তন করেছিলেন কে? কিংবা এই ‘বাংলা নববর্ষ’ উদ্যাপন শুরু হবে কোথা থেকে তা নিয়ে দেদার বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশের গবেষকদের বিশ্বাস শুরুটা হয়েছিল সম্রাট আকবরের মাধ্যমেই। আর সে হিসেবে তাদের দুস্তর আগ্রহ এটাকে বৈশাখ থেকে শুরু করার। মজার ব্যাপার বাংলাদেশে এই বৈশাখকে করা হয়েছে ‘সেকুল্যারকরণ’। বাংলাদেশের বাস্তবতায় খোদ ‘বৈশাখ উদ্যাপনকে’ অনেকে অধর্মের প্রতীক মনে করেন’। যার বিপরীতে ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর মধ্যে আরএসএস ও তাদের অনুসারী বিভিন্ন সংগঠনগুলো পশ্চিমবঙ্গে ঠিক এর উল্টোটারই জোরালো প্রচার ও তাদের ভাষায় ‘সচেতনতা অভিযান’ শুরু করে দিয়েছে। অর্থাৎ আমাদের বাংলাদেশে যে ‘বৈশাখ উদ্যাপন’ কে মনে করা হচ্ছে এর মাধ্যমে ‘ধর্ম নষ্ট হয়ে গেল’। ঠিক ঐ বৈশাখ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেকের ক্ষোভ ‘এর মধ্য দিয়ে আমাদের জাত গেল’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান আর কবিতায় বৈশাখকে খুঁজে পাওয়ার পর বাংলার ‘রবীন্দ্রফেটিশ ইতিহাস তাত্ত্বিক ও সংস্কৃতিবানদের’ মধ্যে আবেগ সঞ্চার হয়। তাঁরা মনে করতে থাকেন ‘যা রবীন্দ্রনাথে আছে সেটাই বিধির লিখন’ তার বাইরে আর কিছু নাই, কিছু বলার কিংবা করার নাই’। তবে বক্তব্যটা আমার একান্ত নিজস্ব। ওদিকে ওপার বাংলার অনেকে বাস্তবতা জানেন। তারা বোঝেন নিরাকার ব্রহ্মার আরাধনাকারী ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী রবীন্দ্রনাথ তাদের কেউ নন। তারা জানেন সাভারকর আর রবীন্দ্রনাথ দুটি দুই মেরু। তাই তাদের কাছে ‘গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক নন, মোগল সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক’ এই কথা মেনে নেওয়া অনেক কঠিন। তারা প্রচার করছেন নতুন করে বাংলা নববর্ষ হবে সেই মাস থেকে যা তাদের আদি ও আসল ‘হিন্দু রাজা’ শশাঙ্ক শুরু করেছিলেন। এমনকি তারা সময়কাল হিসেবে শকাব্দকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে%

