তিনটি বিশ্বকাপজয়ী এই ব্রাজিলিয়ান মহাতারকা শুধু গোল করেই দর্শকদের মুগ্ধ করেননি, বদলে দিয়েছিলেন ফুটবলকে দেখার ধরনও। পুরো নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। তার জীবন ও ক্যারিয়ারে রয়েছে এমন অনেক ঘটনা, যা এখনো ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিস্ময় জাগায়।
ফুটবল মাঠের জাদুকর পেলের জীবন থেকে জানা যাক ২১ অজানা তথ্য-
১. থমাস এডিসনের নামে নাম: পেলে দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড় ছিলেন।
আমেরিকান উদ্ভাবক থমাস এডিসনের নামানুসারে পেলের আসল নাম রাখা হয় ‘এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো’।
২. ডাকনাম নিয়ে বিভ্রান্তি: পেলের পরিবারের দেয়া ডাকনাম ছিল ‘ডিকো’। স্কুলে পড়ার সময় স্থানীয় ভাস্কো দা গামা ক্লাবের গোলরক্ষক ‘বিলে’র নাম সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে না পেরে তিনি ‘পিলে’ বলতেন। সেখান থেকেই সহপাঠীরা তার নাম দেয় ‘পেলে’।
৩. নিজের নামই অপছন্দ: শিশুসুলভ বা ‘বেবি-টক’ শোনাত বলে ‘পেলে’ ডাকনামটি তিনি নিজে কখনোই পছন্দ করতেন না!
৪. জুতোবিহীন সেই দল: শৈশবে বন্ধুদের নিয়ে গঠিত পেলের প্রথম ফুটবল দলটির নাম ছিল ‘দ্য শু-লেস ওয়ানস’ (জুতোহীন দল)।
৫. পিতার রেকর্ড না ভাঙার আফসোস: পেলের বাবা এক ম্যাচে হেডে ৫টি গোল করেছিলেন। পেলে ক্যারিয়ারে অনেক গোল করলেও এক ম্যাচে হেডে ৪টির বেশি গোল করতে পারেননি!
৬. কনিষ্ঠতম বিশ্বজয়ী: মাত্র ১৭ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে ১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপ জেতার অনন্য কীর্তি গড়েন তিনি। সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে করেছিলেন দুই গোল।
৭. একমাত্র তিন বিশ্বকাপজয়ী: আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসে পেলে-ই একমাত্র ফুটবলার, যিনি খেলোয়াড় হিসেবে ৩টি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০) জয় করেছেন।
৮. ১২৮৩ গোলের মাইলফলক: ফার্স্ট-ক্লাস ফুটবলে সর্বমোট ১ হাজার ২৮৩টি গোল করেছেন পেলে, যার মধ্যে ৭৭টি এসেছে জাতীয় দলের জার্সিতে।
৯. ১ ম্যাচে ৮ গোল: ১৯৬৪ সালের ২১ নভেম্বর সান্তোসের হয়ে বোতাফোগোর বিপক্ষে ১১-০ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয়ে একাই ৮টি গোল করেছিলেন তিনি।
১০. ৯২টি হ্যাটট্রিক: ক্যারিয়ারে অবিশ্বাস্য ৯২টি হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। ৩১ ম্যাচে ৪টি করে, ৬ ম্যাচে ৫টি করে এবং ১টি ম্যাচে ৮ গোল করেছেন।
১১. হাজার গোল ও ‘পেলে ডে’: ১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর পেনাল্টি থেকে ১০০০তম গোল করেন পেলে। উন্মাদনায় সমর্থকেরা মাঠে নেমে পড়ায় খেলা ৩০ মিনিট বন্ধ থাকে। সান্তোসে প্রতি বছর ১৯ নভেম্বরকে ‘পেলে ডে’ হিসেবে পালন করা হয়।
১২. পেনাল্টি নিয়ে পেলের মতামত: ১০০০তম গোল পেনাল্টিতে করলেও পেলে মনে করতেন, ‘পেনাল্টি থেকে গোল করাটা গোল করার সবচেয়ে কাপুরুষোচিত উপায়!’
১৩. অজেয় জুটি: ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে পেলে এবং কিংবদন্তি গারিনচা যখন একসঙ্গে মাঠে খেলেছেন, ব্রাজিল কখনো কোনো ম্যাচ হারেনি।
১৪. শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই ইউগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ২-২ গোলে ড্র ম্যাচটিই ছিল তার আন্তর্জাতিক বিদায়ী ম্যাচ।
১৫. দুই দলের হয়ে এক ম্যাচ: ১৯৭৭ সালের ১ অক্টোবর পেশাদার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে সান্তোস ও নিউ ইয়র্ক কসমসের মুখোমুখি লড়াইয়ে প্রথম হাফে যুক্তরাষ্ট্রের দল কসমস এবং দ্বিতীয় হাফে সান্তোসের হয়ে খেলে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
১৬. জাতীয় সম্পদ ঘোষণা: ইউরোপীয় ধনকুবের ক্লাবগুলো যাতে তাকে কিনে নিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য ১৯৬১ সালে ব্রাজিল সরকার পেলেকে ‘অফিশিয়াল জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করে!
১৭. শতাব্দীর সেরা অ্যাথলেট: ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) পেলেকে ‘অ্যাথলেট অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে নির্বাচিত করে।
১৮. ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব: ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রথম ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
১৯. পেলেকে দেখতে যুদ্ধবিরতি: ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়া সফরের সময় এই ফুটবলসম্রাটের খেলা দেখার জন্য দেশটির গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে থাকা সরকারি ও বিদ্রোহী বাহিনী টানা ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল!
২০. পেলের সময়ের অফসাইড: অনেকের ভুল ধারণা পেলের সময় অফসাইড ছিল না। আসলে ফুটবলে অফসাইডের নিয়ম ১৯২৫ সালে চালু হয়েছিল এবং পেলের পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে বহাল ছিল। পেলের যুগে একজন খেলোয়াড় অফসাইড পজিশনে দাঁড়িয়ে থাকলে কিন্তু সরাসরি খেলায় অংশ না নিলেও লাইনসম্যান বা রেফারি অফসাইডের বাঁশি বাজিয়ে দিতেন। বর্তমানে ‘আক্রমণে প্রভাব ফেলছেন কি না’ বিবেচনা করা হয়। ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আজকের এই আধুনিক অফসাইড নিয়ম পেলের আমলে থাকলে তার মোট গোলের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারত।
২১. দুই দলের জার্সিতে বিদায়: ১৯৭৭ সালে পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলেছিলেন পেলে। বিদায়ী সেই ম্যাচে প্রথমার্ধে নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে মাঠে নামেন তিনি, আর দ্বিতীয়ার্ধে পরেন নিজের সাবেক ক্লাব সান্তোসের জার্সি। দুই দলের হয়ে খেলে ফুটবলকে বিদায় জানান ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই কিংবদন্তি।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে মারা যান পেলে। তবে তার বিদায়ে শেষ হয়নি কিংবদন্তির গল্প। বিশ্বকাপের শিরোপা, অসংখ্য গোল, অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য আর ফুটবলে রেখে যাওয়া অবদানের কারণে আজও কোটি মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছেন তিনি।