মোদিকে কী বার্তা ঢাকার
ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বার্তার অনেকগুলো সরাসরি রাজনৈতিক পর্যায়কে অবহিত করার লক্ষ্যে ত্রিবেদী নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ত্রিবেদী দিল্লিতে ভারতের সেনাপ্রধানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বৈঠক করেছেন। দিল্লি যাওয়ার আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করে ঢাকার প্রত্যাশার বিষয়গুলো অবহিত হয়েছেন ত্রিবেদী। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রমতে, বাংলাদেশের বার্তার প্রধান বিষয় হলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আস্থা ফেরাতে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিশেষ কওে শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তিনি যেন ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে দিল্লির তরফে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা অবশ্যই কামনা করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ওসমান হাদি হত্যার আসামিদেরও ফেরত চায় ঢাকা। অন্যদিকে গঙ্গার পানিবন্টন বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করাও ঢাকার অন্যতম চাওয়া। পাশাপাশি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের দেওয়া আটটি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার শর্তও ঢাকার রয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ বাণিজ্য, জ্বালানি, ভিসা সহজীকরণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘উইন উইন’ সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
ঢাকার একজন কর্মকর্তা গতকাল গনমাধ্যম কে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বছরের মধ্যেই ভারত সফরে যাবেন বলে আশা করছি। তবে এ সফরের শর্ত হলো, তিনি যেন জনগণকে দেখানোর মতো কোনো অর্জন নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন। তিনি গত আগস্টে ভারত গেলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে তাড়াহুড়া না করে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি সফর করতে চাইছেন, যাতে একটি অসাধারণ সফর হয়।’
ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের সঙ্গে ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক একটি সুসম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার। দিল্লিরও এ ব্যাপারে আগ্রহ আছে। ফলে ভিতরে ভিতরে দুই দেশের মধ্যে অনেক ধরনের যোগাযোগ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রস্তাব মোতাবেক বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদল দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে। আজ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভারতের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে বাংলাদেশ অনেকটা সন্তুষ্ট। গত ২৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতারা দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তা করতে দেয়নি। তা ছাড়া, সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেটি করতেও ভারত অনুমতি দেয়নি। বৈঠকে অংশ নিতে যেসব নেতা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন, তাঁদের ওই অঞ্চলে বিমানযোগে ফেরত যাওয়ার অনুমতিও দেয়নি ভারত। কারণ বিমানে যেতে হলে বৈধ ডকুমেন্ট প্রয়োজন হয়। সবাইকে তাই ট্রেনযোগে ফিরতে হয়েছে। এসব কিছু প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য সহায়ক ও ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদির সঙ্গে বৈঠকে দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় বঙ্গোপসাগরীয় কনভারসেশনে শেখ হাসিনার বিষয়ে মন্তব্যের দিক নিয়ে আলোচনা করে থাকতে পারেন। কনভারসেশনের একটি সেশনে ত্রিবেদী মন্তব্য করেন যে শেখ হাসিনা ভারতীয় কোনো বিমানে দিল্লি যাননি। তিনি দিল্লি যাবেন সেটিও তিনি জানতেন না। বরং শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন বলে টিভির স্ক্রলে দেখা যাচ্ছিল। ওই অবস্থায় তিনি যখন দিল্লিতে চলে যান, তখন তাঁকে অবতরণ করার অনুমতি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ঠিক কোন দেশে শেখ হাসিনা যেতে চাইছিলেন ত্রিবেদী তার উল্লেখ করেননি। তবে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে, সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে শেখ হাসিনার আশ্রয়ের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
মোদি ও ত্রিবেদীর একান্ত বৈঠক : বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন একান্ত সাক্ষাতের একটি ছবি প্রকাশ করলেও এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত কিছু বলেনি। হাইকমিশনার ভারতের সেনাপ্রধান ধীরাজ শেঠের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠকের আলোকচিত্র সেনা বিভাগ থেকে প্রকাশ করা হয় এবং তাতে লেখা হয়, ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহায়তা নিয়ে কথা হয়েছে। দিল্লির সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন শর্তের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছেন। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক, ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়তে চায়। সম্পর্কের ভিত্তি হলো জনতার কল্যাণ।’ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘আগেও বলেছি, আমরা আইন ও বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব।’
নতুন গঙ্গা চুক্তি চায় বাংলাদেশ : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। ফারাক্কা পয়েন্টে বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে পানি কীভাবে ভাগ হবে, তার একটি ফর্মুলা চুক্তিতে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। প্রতি ১০ দিন পর পরই প্রাপ্ত পানির পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানির ভাগ নির্ধারিত হয় ফারাক্কায় পানির প্রবাহের পরিমাণ অনুযায়ী। চুক্তি অনুযায়ী, যদি প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হয়, তবে দুই দেশ সমান পরিমাণ পানি পাবে। যদি প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে হয়, তবে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক ও ভারত বাকি পানি পায়। আর যখন প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হয়, তখন ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পায় এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পায়। সেই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেকের বেশি পানি পেতে পারে। পানির প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের কম হলে দুই দেশ আলোচনা করে পানির ভাগাভাগি স্থির করবে। কিন্তু এমন জরুরি পরিস্থিতিতে কোন দেশ কী পরিমাণ পানি পাবে সেটা চুক্তিতে নেই। তা ছাড়া গঙ্গায় পানির প্রবাহ কমে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার নতুন করে পানি চাইছে। এ জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ গ্যারান্টিযুক্ত একটি চুক্তি করতে চাইছে। ফলে বিদ্যমান চুক্তি নবায়ন না করে নতুন চুক্তি করতে চাইছে ঢাকা।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বর ডেডলাইন : রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে ফেরার চেষ্টা করলে এবং তাঁর সঙ্গে ভারত সহায়তা করলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনোভাবে প্রবেশ করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে দণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। এ ব্যাপারে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে তাঁকে ফেরত দেওয়া হবে এটাই ঢাকার প্রত্যাশা।

