চীনের নতুন জলপথে বদলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের সংযোগ-মানচিত্র

প্রান্তডেস্ক:দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সমুদ্রবন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে নতুন জলপথ ও করিডর তৈরি করছে।
একই সময়ে ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এই দুই প্রবাহের মাঝখানে অবস্থান করায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ী বন্দর ক্রমেই আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম নতুন সংযোজন দক্ষিণ চীনের ১৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পিংলু খাল। শিজিয়াং নদীকে বেইবু উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের স্থলবেষ্টিত অঞ্চলগুলোর জন্য সমুদ্রগামী যোগাযোগ সহজ করেছে। গুয়াংসি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, নতুন জলপথ ব্যবহারে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার কমবে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পাঁচ হাজার টন পর্যন্ত ধারণক্ষমতার জাহাজ এই পথে চলাচল করতে পারবে।
অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এর কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। ইউনান ও গুইঝৌর মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর জন্য চীন এখন সমুদ্রপথের একাধিক বিকল্প তৈরি করছে। ফলে কোনো একটি করিডর বা বন্দরনির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মিয়ানমার এখনো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ
চীনের এই কৌশলে মিয়ানমারের গুরুত্বও কমছে না। ইউনানের পাশের এই দেশটির রাখাইন উপকূলে কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। কিয়াউকপিউ থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনও ইতোমধ্যে চালু রয়েছে।
চীন ও মিয়ানমার চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর, কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ম্যান্ডালে-মুসে রেলপথ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও কাজ করছে। ফলে বেইবু উপসাগরমুখী পিংলু খাল এবং বঙ্গোপসাগরমুখী মিয়ানমার করিডর—দুই দিকেই চীনের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এই পরিকল্পনার বড় অনিশ্চয়তা মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। দেশটির চলমান সংঘাত করিডর, বন্দর ও অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়নকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। অর্থাৎ অবকাঠামো যতই শক্তিশালী হোক, স্থলভাগের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্থিতিশীলতা ছাড়া এর পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ
এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরাসরি পিংলু খালের অংশ না হলেও দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার ও বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
এরই মধ্যে বেইজিং বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি এখনো বিবেচনাধীন এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের নিজস্ব বন্দর অবকাঠামোও এই সম্ভাবনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। চট্টগ্রাম ও মোংলার পাশাপাশি কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে বড় পদক্ষেপ। ফলে বাংলাদেশ কেবল অন্য দেশের করিডরের ওপর নির্ভরশীল একটি ট্রানজিট ভূখণ্ড নয়; নিজস্ব বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগের সক্রিয় অংশীদার হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে।
ভারতের বিকল্প পথের হিসাব
অন্যদিকে ভারতও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ বাড়াতে একাধিক প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। মিয়ানমার হয়ে ভারতের কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রকল্প এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়ক এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে মিয়ানমারের সংঘাত ভারতের এসব উদ্যোগেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে।
এতে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে একটি বহুমাত্রিক যোগাযোগ কাঠামো তৈরি হচ্ছে। চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সমুদ্রের দিকে বিকল্প পথ তৈরি করছে, ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য নতুন সংযোগ খুঁজছে। আর এই দুই আঞ্চলিক প্রবাহের মাঝখানে বাংলাদেশের বন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে।
প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার সুযোগ
নতুন এই যোগাযোগ-মানচিত্রকে শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দিয়ে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বন্দর, রেল, সড়ক ও নৌপথের উন্নয়ন আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি এক দেশকে অন্য দেশের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একই অবকাঠামো বিভিন্ন দেশের জন্য ব্যবহারযোগ্য হলে বাণিজ্য ব্যয় কমানো এবং পণ্য পরিবহনের সময় কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।
তবে এর সঙ্গে নিরাপত্তা, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মিয়ানমারের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, একটি করিডরের কার্যকারিতা শুধু অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে পিংলু খাল চীনের একটি নতুন জলপথের চেয়ে বড় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ঘিরে ভবিষ্যতের সংযোগব্যবস্থা ক্রমেই বহু-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। সেই পরিবর্তনে চীন ও ভারত নিজেদের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন পথ খুঁজছে, আর বাংলাদেশের সামনে তৈরি হচ্ছে বন্দর, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে নিজস্ব বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমন নীতি গ্রহণ করা, যাতে আঞ্চলিক সংযোগের সুবিধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কাজে লাগে।

