বাজেটে সরকারের ১০ অগ্রাধিকার সময়োপযোগী, বলছে এমসিসিআই

প্রান্তডেস্ক:প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
সংগঠনটির মতে, অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার অত্যন্ত সময়োপযোগী।
সংগঠনটি বলছে, বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যে এ বাজেট প্রণয়ন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দায়িত্ব।
এমসিসিআইর মতে, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা করলে করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি। এমসিসিআই মনে করে, এসব উদ্যোগ কার্যকর হলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এমসিসিআই উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৭.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ৬.৪০ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ২১.৫৩ শতাংশ। বিনিয়োগ হ্রাসের ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ বলে এমসিসিআই মনে করে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়কালে রাজস্ব আহরণ হয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ এবং এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১.৪১ শতাংশ।
নতুন কোনো করহার বৃদ্ধি না করে করের আওতা সম্প্রসারণের নীতিকে এমসিসিআই সমর্থন করে। একই সাথে ৬৯৫,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর প্রশাসনের কাঠামোগত ও ডিজিটাল সংস্কার অপরিহার্য বলে চেম্বার মনে করে।
এমসিসিআই উৎসে করসংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানায়, কারণ বর্তমান আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন না করলে সম্পূর্ণ ব্যয়কে ‘অননুমোদন যোগ্য’ হিসেবে গণ্য করে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর-দায় আরোপ করা হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিধান সংশোধন করে সম্পূর্ণ ব্যয়কে অননুমোদন যোগ্য ঘোষণা করার পরিবর্তে শুধু বকেয়া উৎসে কর এবং তার ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা কর ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করবে এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত কর ঝুঁকি হ্রাস করবে।
ব্যক্তিগত করদাতাদের প্রকৃত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একদিকে সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ রেয়াতের সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে, যা নিয়মিত কর প্রদানে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে।
এমসিসিআই মনে করে, প্রস্তাবিত ডেটা কানেক্টিভিটি বা তথ্যের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহার হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে, যা ডেটার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যথাযথ আইনি সুরক্ষা ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া এ ধরনের কানেক্টিভিটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের দ্বারা তথ্যের অপব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যে অননুমোদিত নজরদারি বা তথ্যের অনৈতিক অনুসন্ধান চালানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই, তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সুদৃঢ় ও সমন্বিত আইনি এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা ব্যতিরেকে এ ধরনের সংযোগ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া সমীচীন হবে না বলে এমসিসিআই মনে করে।
মূল ভ্যাট আইন, ২০১২-এর কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় এমসিসিআই হতাশ। চেম্বারের মতে, ই-ইনভয়েসিং ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ভ্যাট সংগ্রহ প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট নেট সম্প্রসারণ করে সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে চেম্বার মনে করে।
এছাড়া, পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহন সেবার উপর ১০০ শতাংশ ভ্যাট রেয়াত বহাল রাখা এবং ধারা ২০-এ কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও সামগ্রিক রেয়াত কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে এমসিসিআই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। এর ফলে লজিস্টিকস ব্যয় কমবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের খরচ হ্রাসের মাধ্যমে বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মেগা বাজেট দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি সাহসী উদ্যোগ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, কর প্রশাসনের হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, রাজস্ব আহরণের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এমসিসিআই সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।(সৌজন্যে :জাগো নিউজ২৪.কম)

