ধ্বংসস্তূপ থেকে হিজবুল্লাহর পুনরুত্থান, ইসরায়েলি দম্ভ মিশল মাটিতে

প্রান্তডেস্ক:২০২৪ সালের বিধ্বংসী যুদ্ধের পর ইসরায়েল, ওয়াশিংটন এমনকি লেবানন সরকারও জোর গলায় দাবি করেছিল হিজবুল্লাহর কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, হিজবুল্লাহ ‘কয়েক দশক’ পিছিয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান রণক্ষেত্র বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক দিনের টানা রকেট ও ড্রোন হামলা প্রমাণ করছে হিজবুল্লাহ কেবল টিকেই নেই বরং তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্র ও দুর্ভেদ্য হয়ে ফিরে এসেছে।
২৭ নভেম্বর ২০২৪-এ যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, বিশ্ব ভেবেছিল এটিই হিজবুল্লাহর শেষের শুরু। কিন্তু সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, তারা এই সময়টিকে রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে নয় বরং পুনর্গঠনের একটি ‘ইমারজেন্সি উইন্ডো’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। যুদ্ধবিরতির ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২৮ নভেম্বর থেকেই শুরু হয় তাদের গোপন পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। হিজবুল্লাহর বিশ্বাস ছিল, ইসরায়েলের সাথে পরবর্তী দফার লড়াই কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
২০২৪-এর যুদ্ধে পেজার বিস্ফোরণ এবং হাসান নাসরুল্লাহসহ শীর্ষ নেতাদের হারানোর পর হিজবুল্লাহ তাদের রণকৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। সিরিয়া যুদ্ধের সময় তারা একটি প্রথাগত বড় সেনাবাহিনীর রূপ নিয়েছিল, যা তাদের গোয়েন্দা নজরদারির শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান পুনর্গঠনে তারা ফিরে গেছে ইমাদ মুগনিয়ার সেই পুরনো ‘গেরিলা স্পিরিট’-এ; যেখানে ছোট ছোট আধাস্বায়ত্তশাসিত ইউনিটগুলো কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়াই স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হিজবুল্লাহর ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় কতটা গভীরে ঢুকেছিল, তা পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণে স্পষ্ট হয়। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হিজবুল্লাহ এখন হাই-টেক প্রযুক্তি বর্জন করেছে। সংবেদনশীল বার্তার জন্য তারা এখন মানুষের মাধ্যমে হাতে লেখা চিরকুট বা ‘হিউম্যান কুরিয়ার’ ব্যবহার করছে। এই ‘আদিম’ পদ্ধতিই এখন তাদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিটানি নদীর দক্ষিণ অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার দাবি করেছিল লেবানন সেনাবাহিনী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা সেখান থেকে কোথাও যায়নি। তারা বড় কোনো সামরিক মহড়া না দেখিয়ে বরং ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গ ও গোপন আস্তানাগুলো মেরামত করেছে। দিনের আলো আর রাতের অন্ধকারকে এক করে তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেদের পুরনো অবস্থানগুলো পুনরায় দখল করেছে।
আসাদ সরকারের পতনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরবরাহের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সূত্র বলছে, সিরিয়ার সেই চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়েই হিজবুল্লাহ তাদের প্রধান ডিপোগুলো খালি করে বড় অংকের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লেবাননে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এছাড়া নিজস্ব কারখানায় রকেট ও ড্রোনের উৎপাদন বাড়িয়ে তারা তাদের ভাণ্ডার পুনরায় পূর্ণ করেছে।
গত ২ মার্চ থেকে হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি পুনরায় দৃশ্যমান হয়। ইসরায়েলের গভীরে লক্ষ্য করে মাত্র কয়েক দিনে শত শত ড্রোন ও রকেট নিক্ষেপ করেছে তারা। এমনকি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এখন ইসরায়েলের আশকেলন এবং গাজা সংলগ্ন এলাকাগুলোতেও আঘাত হানছে, যা প্রমাণ করে যে তাদের কমান্ড চেইন এবং লজিস্টিক সাপোর্ট আবারও পূর্ণ শক্তিতে কাজ করছে।
হিজবুল্লাহর নিহত মিডিয়া প্রধান মোহাম্মদ আফিফ বলতেন, হিজবুল্লাহ কোনো দল নয়, এটি একটি জাতি; আর জাতি কখনো মরে না। সমালোচকরা এটিকে এক সময় স্রেফ রাজনৈতিক স্লোগান মনে করলেও ২০২৬-এর বাস্তবতা হিজবুল্লাহ সমর্থকদের সেই বিশ্বাসকেই যেন প্রতিষ্ঠিত করছে। বড় ধরনের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সইলেও কৌশলগত পুনরুত্থানের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে আবারও এক অনিবার্য শক্তি হিসেবে নিজেদের জানান দিচ্ছে।
মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

