সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের আধিক্য
২০২৫ সালে ভারতীয়দের ছড়ানো যে ১৫৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার, তার মধ্যে ৯১টিই সাম্প্রদায়িক অপতথ্য। অর্থাৎ, শনাক্ত হওয়া অপতথ্যগুলোর প্রায় ৫৮ শতাংশই সাম্প্রদায়িক ঘটনা সংক্রান্ত। ভারতীয়দের সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রচারের ক্ষেত্রে বড় এক মাধ্যম এক্স। গেলো বছর এক্সে ভারতীয়দের ছড়ানো সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের সংখ্যা অন্তত ৮৫টি।
সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের এই ক্যাম্পেইনে ভারতীয় গণমাধ্যমও রেখেছে ভূমিকা। অন্তত ১০টি ঘটনায় ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় এনডিটিভি, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জি নিউজ, ওয়ার্ল্ড ইজ ওয়ান নিউজ, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮, টিভি নাইন, এবিপি, মিরর নাউ এর মতো মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা
রাজীবের আশঙ্কা, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা যদি সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট, দৃঢ় ও নৈতিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রতিবেশী দেশের গণমাধ্যমে এই অতিরঞ্জিত ও বিকৃত বয়ান ভবিষ্যতেও পুনরুৎপাদিত হতে থাকবে।
অর্ক ভাদুড়ী মনে করেন, ফ্যাক্টচেকিংসহ দুদেশের জনতার মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির কিছুটা নিরাময় সম্ভব।
রিউমার স্ক্যানার ২০২৫ সালে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভুল তথ্য নিয়ে প্রকাশিত ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণ করে ৩৮টি ঘটনায় দেশটির ৭৩টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে। এই সংবাদমাধ্যমগুলোতে সর্বোচ্চ ১০টি থেকে সর্বনিম্ন একটি ভুল তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া গেছে।
পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচারের দরুন প্রথম স্থানে রয়েছে ভারতের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ‘আজতক বাংলা’। ৩২টি ঘটনার মধ্যে ১০টিতেই এই চ্যানেল ভুল তথ্য প্রচার করেছে। ২০২৪ সালে এই তালিকায় আজতকের অবস্থান ছিল চতুর্থ।গত বছরের ৯ জুলাই ঢাকায় মিটফোর্ডে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ। এরই প্রেক্ষিতে অন্তত ২৭টি ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, সোহাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। একক কোনো ঘটনায় গেল বছর এটিই ভারতীয় গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ কাভারেজ সংখ্যা। মুসলিমকে হিন্দু বানিয়ে অপপ্রচার
গেল বছর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভুয়া খবর এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণার ধরণের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণটি হলো, কোনো একজন মুসলিম ঘটনাক্রমে হামলা বা নিগ্রহের শিকার হলে সেই ব্যক্তিকে হিন্দু দাবি করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে৷ ২০২৫ সালে এমন অন্তত ৩৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। আরেকটি পরিচিত ধরণ হচ্ছে, পুরোনো কোনো ঘটনাকে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক হামলার সাম্প্রতিক ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া। এমন অন্তত ৮টি ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমার স্ক্যানার।
বিশ্লেষকদের মত
বিষয়টি নিয়ে রিউমর স্ক্যানার আলাপ করেছে ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ভুল তথ্যের এই প্রভাবে ভারত এবং বাংলাদেশ- দুই দেশের জনগণের মধ্যেকার সম্পর্ক চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি দেশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা গড়ে উঠছে আরেকটি দেশের জনমনে৷ তীব্র ঘৃণা, বিদ্বেষের জন্ম হচ্ছে৷
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব নন্দী মনে করেন, দায় আছে বাংলাদেশেরও। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সের লাগামহীন বৃদ্ধি, ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক হামলা এবং এসব ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দৃঢ় ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিক্রিয়ার অভাব ভারতীয় মিডিয়ার এই অতিরঞ্জনের জন্য কার্যত বাস্তব কাঁচামাল সরবরাহ করছে।