প্রান্তডেস্ক:নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে এক নতুন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী দাঁড়ালেন বিশ্বনেতাদের সামনে। রাষ্ট্রটির বয়স তখন মাত্র তিন বছর। যুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি, অর্থনীতি নাজুক, খাদ্যসংকট তীব্র। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচয়ও তখনো নতুন।

সেই মুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমানের সামনে ছিল আরেকটি সিদ্ধান্ত; কোন ভাষায় তিনি কথা বলবেন?তিনি বেছে নিলেন বাংলা।

প্রায় ১০ মিনিটের সেই ভাষণ শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম জাতিসংঘ বক্তৃতা ছিল না; এটি ছিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলায় দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ভাষণ। সেদিন বিশ্বমঞ্চে একটি নতুন দেশের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল তার মানুষের মাতৃভাষাও।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পর আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সদস্যপদ লাভ করে দেশটি। এর মাত্র আট দিন পর শেখ মুজিবুর রহমান যোগ দেন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে।

ঢাকা থেকে তিনি নিউইয়র্কে রওনা হন ২৩ সেপ্টেম্বর। তাঁর সঙ্গে ছিল ২৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। দুই দিন পরই তাঁকে দাঁড়াতে হয় বিশ্বের বহু দেশের প্রতিনিধির সামনে।

বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সে সময় জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষা ছিল আরবি, চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রুশ ও স্প্যানিশ। বাংলা সেই তালিকায় ছিল না। তবু শেখ মুজিব বাংলাতেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

তাকে ইংরেজিতে বক্তৃতা দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। উইকিপিডিয়ার সূত্রভিত্তিক বর্ণনা অনুযায়ী, আলজেরিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান হুয়ারি বুমেদিয়ান তাঁকে ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। শেখ মুজিব সেই অনুরোধ গ্রহণ করেননি। তিনি বাংলাতেই ভাষণ দেন।

ভাষণটির খসড়া তৈরির কাজও ছিল আলাদা একটি অধ্যায়।

তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর একটি খসড়া তৈরি করে শেখ মুজিবের কাছে দেন। সেটি তিনি গ্রহণ করেননি। পরে পররাষ্ট্র সচিব ফখরুদ্দিন আহমেদ ও যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার ফারুক আহমেদ চৌধুরী আরেকটি খসড়া তৈরি করেন।

কিন্তু সেই খসড়াতেও বাংলাদেশের তৎকালীন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যথেষ্টভাবে উঠে আসেনি খাদ্যসংকট।

শেখ মুজিব সেই বিষয়টি যুক্ত করার নির্দেশ দেন। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের সংকটের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।

এটি ছিল এমন এক সময়, যখন স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাই ভাষণটি কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বক্তব্য হয়ে থাকেনি; এর মধ্যে ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতার কথাও।ভাষণের শুরুতেই শেখ মুজিব বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সামনে আনেন।

তিনি বলেন, “আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন।”

এরপর তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামের পূর্ণতা হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে ভাষণের পরিধি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

শান্তি, মানবতা, ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট এসব বিষয়ও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা ও একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন। স্বাধীনতার জন্য যারা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।

অর্থাৎ, একদিকে নিজের দেশের ক্ষুধা ও সংকটের কথা, অন্যদিকে বিশ্বমানবতার বৃহত্তর প্রশ্ন দুটি বিষয়ই জায়গা পেয়েছিল সেই ১০ মিনিটে।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল ধারণাও ভাষণে উঠে আসে।

পরবর্তী সময়ে এই বাক্যটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবেও ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব এবং কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়’ এই ভাবনাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখানে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, নিরক্ষরতা ও বেকারত্ব মোকাবিলায় সহযোগিতা, সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করা হয়।

সেদিনের ভাষণ নিয়ে পরবর্তী বিভিন্ন লেখায় আরেকটি দৃশ্যের কথা এসেছে সাধারণ পরিষদের হল ছিল পূর্ণ।

উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত সূত্র অনুযায়ী, জাতিসংঘের অধিবেশনে সাধারণত উপস্থিতি কম থাকলেও সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের বক্তব্য শুনতে সেদিন আগ্রহ ছিল বেশি। ভাষণটি তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেও প্রশংসা পায়।

তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম ভাষণটিকে ‘অকপট ও গঠনমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেন বলে সূত্রে উল্লেখ আছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব জেমস ক্যালাহান ভাষণটিকে ‘শক্তিশালী’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

বাংলা ভাষার মর্যাদার দিক থেকেও ঘটনাটি পরে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। সাংবাদিক ও লেখক সন্তোষ গুপ্ত মনে করেছিলেন, জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাষাটির মর্যাদা আরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্য লেখকেরাও ভাষণটির ঐতিহাসিক ও প্রতীকী গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪-এর সেই ভাষণ শেষ হয়ে গিয়েছিল প্রায় ১০ মিনিটে। কিন্তু এর প্রতীকী প্রভাব রয়ে যায় দীর্ঘদিন।( সৌজন্যে:সিলেট ভয়েস)