২৩ সেপ্টেম্বর: যে দিনে থেমেছিল ভারত–পাকিস্তানের ২২ দিনের যুদ্ধ
প্রান্তডেস্ক:১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর। কাশ্মীর থেকে পাঞ্জাব সীমান্তজুড়ে তখন গোলাবারুদের শব্দ। আকাশে যুদ্ধবিমান, মাটিতে ট্যাংক, আর সীমান্তের দুই পাশে লাখো মানুষের উদ্বেগ। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে বড় শক্তিগুলোর চাপও বাড়ছে। অবশেষে জাতিসংঘের আহ্বানে আসে যুদ্ধবিরতি। ২৩ সেপ্টেম্বরের ভোরে কার্যকর হয় সেই যুদ্ধবিরতি। থেমে যায় ১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের বড় ধরনের সামরিক সংঘাত।
আজ থেকে ৬১ বছর আগে, ১৯৬৫ সালের এই সেপ্টেম্বরেই দক্ষিণ এশিয়া দেখেছিল স্বাধীনতার পর ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ। এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল জম্মু ও কাশ্মীর। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত কাশ্মীরের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের ময়দানে দুই দেশই বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়; আকাশে ও স্থলপথে চলে তীব্র লড়াই। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই কাশ্মীর প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান করতে পারেনি।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার পর থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধের কেন্দ্রে। স্বাধীনতার পরপরই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়। ১৯৪৭–৪৮ সালের সেই যুদ্ধ জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় থামলেও কাশ্মীরের প্রশ্নের সমাধান হয়নি।
১৯৬৫ সালে পুরোনো বিরোধ আবার সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
এর আগে ওই বছরের এপ্রিল ও মে মাসে কচ্ছের রান এলাকায় ভারত ও পাকিস্তানের বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। জুনের শেষে ব্রিটিশ মধ্যস্থতায় সেখানে যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী সালিসির পথ তৈরি হয়। কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনা কমেনি।
আগস্টে পাকিস্তান কাশ্মীরে সশস্ত্র অনুপ্রবেশের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই অভিযান ইতিহাসে অপারেশন জিব্রাল্টার নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিদ্রোহ উসকে দেওয়া। কিন্তু পরিকল্পনাটি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এরপর সংঘাত আরও বড় আকার নেয়।
১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান অপারেশন গ্র্যান্ড স্লাম শুরু করে। আখনুরের দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ভারতীয় সামরিক নেতৃত্বকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ কাশ্মীরের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
৬ সেপ্টেম্বর ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে আক্রমণ শুরু করে। লাহোরমুখী অগ্রযাত্রা এবং পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ যুদ্ধের পরিধি দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে পাকিস্তানও পাল্টা আক্রমণ চালায়। এভাবেই কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত পূর্ণাঙ্গ ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে রূপ নেয়।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যাপক ট্যাংকযুদ্ধ। পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় দুই দেশের সাঁজোয়া বাহিনী মুখোমুখি হয়।
এর মধ্যে আসল উত্তরার যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের আসল উত্তরা এলাকায় বড় ধরনের ট্যাংকযুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী প্যাটন ট্যাংকের বিপরীতে ভারতীয় বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যুদ্ধের শেষে পাকিস্তানি বাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ট্যাংক ধ্বংস বা অচল হয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন সামরিক ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আকাশেও দুই দেশের বিমানবাহিনী ব্যাপকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বরজুড়ে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বিমানবাহিনী একে অপরের ঘাঁটি ও সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়। বিমান হারানোর হিসাব নিয়ে দুই দেশের সরকারি দাবির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে; স্বাধীন সূত্রগুলোর হিসাবও সব ক্ষেত্রে এক নয়।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছিল, ততই স্পষ্ট হচ্ছিল এটি দ্রুত শেষ হওয়ার মতো সংঘাত নয়।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়তে থাকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। ৪ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের ২০৯ নম্বর এবং ৬ সেপ্টেম্বর ২১০ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে সংঘাত বন্ধের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ তখনও চলছিল।
২০ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ ২১১ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং পরে ৫ আগস্টের আগের অবস্থানে দুই পক্ষের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। প্রস্তাবটি ১০ ভোটে পাস হয়; জর্ডান ভোটদানে বিরত ছিল।
তখন যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিও বদলাচ্ছিল। দুই দেশই ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দুই দেশের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের প্রভাব পাকিস্তানের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ার আশঙ্কা ছিল, কারণ দেশটির সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ বিদেশি উৎসনির্ভর ছিল।
জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল। ভারত যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানালেও পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা চলছিল। ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি গ্রহণের ঘোষণা দেন। এরপর যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারণ করা হয়।
জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় নির্ধারিত হয় ২২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা GMT। পাকিস্তানের স্থানীয় সময়ে সেটি ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৩টা এবং নয়াদিল্লির স্থানীয় সময়ে ২৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৩টা ৩০ মিনিট। অর্থাৎ ক্যালেন্ডারে ২৩ সেপ্টেম্বরের শুরুতেই থামার কথা ছিল যুদ্ধ।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে বলা হয়, ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে পালিত হচ্ছিল এবং তখন পর্যন্ত বড় কোনো লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যায়নি। তবে সীমান্তে বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ছিল।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি এটাই। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই যুদ্ধের পর নিজেদের সাফল্যের দাবি করে। ভূখণ্ড দখল, ট্যাংক ও বিমান ধ্বংস এবং হতাহতের হিসাবেও দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। স্বাধীন বিভিন্ন হিসাবেও সংখ্যাগুলো এক নয়। ফলে যুদ্ধের ফলাফলকে এককভাবে ‘জয়’ বা ‘পরাজয়’ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে।
তবে একটি বিষয়ে বিতর্ক তুলনামূলক কম যুদ্ধ কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। যে প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যুদ্ধ শেষে সেই প্রশ্নই রয়ে গেল।
২৩ সেপ্টেম্বর বন্দুকের শব্দ থামলেও ভারত–পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। যুদ্ধবিরতি ছিল সংঘাত থামানোর একটি ধাপ, চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমাধান নয়।
জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী দুই পক্ষের সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নও সামনে আসে। যুদ্ধবিরতির পর জাতিসংঘকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আরও সক্রিয় হতে হয়। কাশ্মীরের যুদ্ধবিরতি রেখায় আগে থেকেই জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা ছিল; আন্তর্জাতিক সীমান্তের অন্যান্য অংশে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য পরে United Nations India-Pakistan Observation Mission (UNIPOM) গঠন করা হয়। অন্যদিকে যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে এগিয়ে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিনের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের নেতারা উজবেকিস্তানের তাসখন্দে বৈঠকে বসেন। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত তাসখন্দ ঘোষণা দুই দেশের সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি করে। কিন্তু কাশ্মীর প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান সেখানে হয়নি।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছিল, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরকে ঘিরে বিরোধ কত দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধটি দেখিয়েছিল, আঞ্চলিক সংঘাত খুব সহজেই স্নায়ুযুদ্ধের বৃহত্তর ভূরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং জাতিসংঘ সবাই কোনো না কোনোভাবে এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। আর ২৩ সেপ্টেম্বর হয়ে রইল সেই যুদ্ধের একটি প্রতীকী তারিখ। একদিকে যুদ্ধবিরতির দিন। অন্যদিকে একটি অসমাপ্ত বিরোধের নতুন অধ্যায়ের শুরু।(সৌজন্যে:সিলেট ভয়েস)

