ডেথ ফ্যাক্টরি ৭৩১: বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার নামে পৈশাচিক গণহত্যা

এই ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের মূল নেপথ্য কারিগর ছিলেন এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও নিষ্ঠুর অণুজীববিজ্ঞানী, সার্জন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শিরো ইশি। বিশ্বভ্রমণ শেষে ১৯২৫ সালের জেনেভা প্রোটোকলের ফাঁকফোকর ধরে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভয়াবহ জৈব ও রাসায়নিক মারণাস্ত্রই হতে পারে পরাশক্তিগুলোকে হাঁটু গেড়ে বসানোর মূল অস্ত্র। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজকীয় ছত্রচ্ছায়ায় মানচুরিয়ার বুকে ৩ হাজার কর্মীর বিশাল সুরক্ষিত দুর্গ গড়ে তোলেন ইশি। সেখানে চীনা নাগরিক, সীমান্তে আটক করা সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী এবং কোরীয়দের ওপর চালানো হতো অবর্ণনীয় পৈশাচিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নথিপত্রে এই বন্দীদের মানুষের মর্যাদাও দেওয়া হয়নি; তাদের ডাকা হতো ‘মারুতা’ বা কাঠের গুঁড়ি নামে।
পরীক্ষাগারের বন্ধ ঘরের ভেতর দিনদুপুরে ঘটা সেই দৃশ্যগুলো যেকোনো সুস্থ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। সেখানে অ্যানেস্থেসিয়া বা চেতনানাশক ছাড়াই জীবন্ত মানুষের শরীর কেটে রক্তমাংস আলাদা করে ফেলা হতো, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ভিভিসেকশন’ নামে পরিচিত। সার্জনেরা একজন সুস্থ মানুষের মস্তিষ্ক বা অঙ্গ বের করতে নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ দিত, আর তারা বন্দীর মাথায় কুড়াল দিয়ে আঘাত করে মাথার খুলি আলাদা করে ডাক্তারদের হাতে তুলে দিত। কোনো কোনো বন্দীর রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো প্লেগ, কলেরা, টাইফাস কিংবা সিফিলিসের জীবাণু; দেখতে চাওয়া হতো রোগের চূড়ান্ত ভয়াবহতায় মানবদেহের সাড়া কেমন হয়। প্রচণ্ড শীতে বন্দীদের বরফজলে ডুবিয়ে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় বাইরে ফেলে রাখা হতো ফ্রস্টবাইটের মাত্রা মাপতে। কখনো চাপযুক্ত কক্ষে রেখে ফুসফুস ফাটিয়ে দেওয়া হতো, কখনো বা ভারী বস্তুর নিচে পিষে, বিষাক্ত গ্যাসে কিংবা জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বিভীষিকাময় মহড়া চলত। এই পৈশাচিকতা কোনো অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনা ছিল না; প্রতিটি পরীক্ষা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভিডিওতে রেকর্ড করা হতো এবং উচ্চপদস্থ জাপানি কর্তাদের বিনোদনের জন্য এসব জীবন্ত অঙ্গচ্ছেদ প্রদর্শনী হিসেবে দেখানো হতো।
শুধু ল্যাবরেটরির চার দেয়াল নয়, ইশির এই মারণাস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল চীনের সাধারণ জনপদেও। ১৯৩৯ সালে খালখিন গোল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত সীমান্ত নদীতে টাইফাসের জীবাণু মিশিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে চীনের নিংবো ও চাংদে শহরে বিমান থেকে প্লেগ আক্রান্ত মাছি ও সংক্রমিত খাবার ফেলা হয়েছিল। এতে অন্তত দুই লক্ষাধিক নিরপরাধ চীনা নাগরিক মহামারী ও রোগে ভুগে ছটফট করে মারা যান। যুদ্ধের একদম শেষভাগে এসে জাপানি নৌবাহিনী ক্যালিফোর্নিয়ার শহরগুলোতে কামিকাজে বিমান ও সাবমেরিনের মাধ্যমে প্লেগ ও কলেরা ছড়িয়ে দেওয়ার নীলনকশাও তৈরি করেছিল, যা কেবল যুদ্ধ শেষ হওয়ার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৪৫ সালের আগস্টে সোভিয়েত লাল ফৌজ যখন এশিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে মানচুরিয়ায় প্রবেশ করে, তখন গোপনীয়তা রক্ষায় ইউনিট ৭৩১-এর সব ভবন উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বেঁচে থাকা বাকি ৩০০ বন্দী ও ৬০০ শ্রমিককে বিষ খাইয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু অপরাধীদের কপালে যে শাস্তি জোটার কথা ছিল, তা বিশ্ব রাজনীতির নোংরা খেলায় ভেস্তে যায়। যুদ্ধের পর জাপান দখলকারী যুক্তরাষ্ট্র পুরো সত্য জেনেও শিরো ইশি এবং তার সহযোগীদের সঙ্গে এক গোপন অশুভ আঁতাত করে। মার্কিন প্রশাসন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তভেজা সেই জৈব মারণাস্ত্রের গবেষণাপত্র, ল্যাব রিপোর্ট এবং ভিভিসেকশনের সমস্ত ডেটার বিনিময়ে অপরাধীদের সম্পূর্ণ আইনি দায়মুক্তি বা ‘ইমিউনিটি’ প্রদান করে। সম্রাট হিরোহিতোকেও ট্রাইব্যুনাল থেকে মুক্ত রাখা হয়।
যেখানে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন খাবারোভস্ক বিচারে কয়েকজন জাপানি যুদ্ধাপরাধীকে সাজা দিতে পেরেছিল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় মূল অপরাধী শিরো ইশি এবং তার সহযোগীরা দীর্ঘ ও শান্ত জীবনযাপন করেন। তারা পরবর্তীতে জাপানের মূলধারার চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্পোরেট জগতের শীর্ষ পদে সমাসীন হন। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের কাটাছেঁড়া আর আর্তনাদের ওপর দাঁড়িয়ে রচিত হয়েছিল তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী অপরাধের এই গোপন চুক্তি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।
সূত্র: আরটি

