খাবার পৌঁছে দেওয়ার ফাঁকে লিখতেন কবিতা, ডেলিভারি রাইডার জিতলেন সাহিত্য পুরস্কার

প্রান্তডেস্ক:খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজের ফাঁকে কাগজের টুকরোয় কবিতা লিখতেন ওয়াং জিবিং। সেই লেখালেখিই তাকে এনে দিয়েছে চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মাননা।
কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্যেও বই পড়ার প্রতি ওয়াং জিবিংয়ের আগ্রহ কখনো কমেনি। গত এক দশক ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করে আসছেন।
২০২২ সালে তার ‘ম্যান ইন এ হারি’ শিরোনামের একটি কবিতা অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কবিতাটি ২০১৯ সালের একটি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা, যখন এক গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ায় একটি ডেলিভারি সম্পন্ন করতে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তিনি ‘ম্যান ইন এ হারি : পোয়েমস অব এ ফুড ডেলিভারি রাইডার’ নামে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেও ওয়াং জানিয়েছেন, চাকরি ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে চান।
গ্লোবাল টাইমসকে ওয়াং জিবিং বলেন, ‘এখন জীবিকা নির্বাহের জন্য এই চাকরির ওপর আমার নির্ভর করতে হয় না। তবুও আমি এই কাজটি চালিয়ে যেতে চাই, কারণ এর পরিবেশ আমার ভালো লাগে এবং এটি আমাকে শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখে। আমি সাধারণ জীবনযাপন করতে চাই। এই পুরস্কার আমার পরিচয় বা জীবনদর্শন বদলে দিতে পারবে না।’
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ হলো ডেলিভারি রাইডারদের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা কবিতার একটি সংকলন। বইটি রচনার জন্য ওয়াং জিবিং প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার ও মতামত সংগ্রহ করেছিলেন। সংকলনের একটি উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি হলো, ‘কে বলে ডানা মেললেই আকাশে উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।’ এই লাইনটি সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও মর্যাদাকে তুলে ধরে।
ওয়াংয়ের এই সাফল্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চীনে ক্রমশ বেশিসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রাম তুলে ধরছেন এবং সাহিত্য অঙ্গনে স্বীকৃতি অর্জন করছেন।
প্রাক্তন কুরিয়ার হু আনিয়ানের ২০২৩ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা ‘আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং’ চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও নজর কেড়ে নেয়। বইটির ইংরেজি অনুবাদ গত বছর প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া ‘আই অ্যাম ফ্যান ইউসু’ নামে একজন অভিবাসী শ্রমিকের আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ ২০১৭ সালে চীনের ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা ওই লেখাটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, গণমাধ্যমের অতিরিক্ত আগ্রহ ও চাপের কারণে লেখক ফ্যান ইউসুকে কিছু সময়ের জন্য নিজের বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয়েছিল।
ওয়াং জিবিং যে লু শুন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন, সেটির নামকরণ করা হয়েছে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী চীনা লেখক লু শুনের নামে। তিনি ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও উপন্যাসের মাধ্যমে চীনের তৎকালীন সমাজব্যবস্থার সমালোচনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
চীনা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে লু শুন আজও ব্যাপকভাবে স্মরণীয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার লেখাগুলো নতুন প্রজন্মের মধ্যেও নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কয়েক বছর আগে তার একটি উপন্যাসের চরিত্র ‘কং ইজি’ চাকরি খুঁজতে হিমশিম খাওয়া চীনা তরুণদের হতাশা ও মোহভঙ্গের প্রতীক হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি জনপ্রিয় ‘মিম’-এ পরিণত হয়েছিল।

