আজ সেই ভয়াল কালরাত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের ক্যান্টিনের সামনে পড়ে ছিল হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার কয়েকটি মৃতদেহ।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া হয় নিরীহ অসংখ্য বাঙালির প্রাণ। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে বাঙালি। শুরু হয় ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি পায় তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, নতুন পতাকায় লেখা হয় বাংলাদেশের ইতিহাস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালে এই গণহত্যার দিনটিকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে আসছে জাতি। প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, “২৫ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে নৃশংস ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। এই গণহত্যায় পুরো জাতি বাকরুদ্ধ ও স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চের দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে গণহত্যার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং এর অব্যবহিত পর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তদানীন্তন মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, অসীম সাহসী করে তোলে, সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ও প্রাণ উৎসর্গ করতে উজ্জীবিত করে। শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র প্রতিরোধ ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস পর লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় গৌরবময় বিজয়।”
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক, উন্নত-সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “২৫ মার্চ ১৯৭১, গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত ও নৃশংসতম গণহত্যার দিন। এই কালরাতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বাংলাদেশের নিরস্ত্র স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা চালায়। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও নিরপরাধ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং হত্যা করে।”
অপারেশন সার্চলাইটের লিখিত নির্দেশনা ছিল না অপারেশন সার্চলাইট অভিযানের নির্দেশনামা তৈরি করেন পাকিস্তানের দুই সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। তবে এই নির্দেশনামার কোনো লিখিত নথি রাখা হয়নি। ঘৃণ্য গণহত্যার পুরো নির্দেশনাটি মুখে মুখে ফরমেশন কমান্ডার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়ে দেওয়া হয়।
ফার্মগেটে মিছিলরত ছাত্র-জনতার ওপর হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সূচনা হয়। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী একযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগসহ সমগ্র ঢাকা শহরের ঘুমন্ত্র মানুষের ওপর আক্রমণ চালায় সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনী।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করতে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তৎকালীন আইজিপির দেহরক্ষী কনস্টেবল আব্দুল আলী অস্ত্রাগারের পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে সবাইকে একত্রিত করেন। সেসময় ব্যারাকে প্রায় ৭০০ বাঙালি পুলিশ ছিল। অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বের করে অস্ত্র নিয়ে পুলিশ সদস্যরা পুলিশ লাইনসের চারদিকে অবস্থান নেন। পুলিশ লাইনসের পূর্বদিকে ওয়্যারলেসগেট থেকে রাস্তার পশ্চিম দিক পর্যন্ত ২০০ বাঙালি পুলিশ সদস্য রাস্তার দিক মুখ করে অবস্থান নেন। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কনভয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের মেইন গেটের সামনে এসে পৌঁছয়।
৫ মিনিট পর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের দক্ষিণ-পূর্বদিক পুলিশ হাসপাতাল কোয়ার্টার সংলগ্ন থেকে পাকিস্তানি সেনারা প্রথম গুলিবর্ষণ করে। সঙ্গে সঙ্গেই প্যারেড গ্রাউন্ডের উত্তর-পূর্বদিক শাহজাহানপুর ক্রসিং থেকেও গুলিবর্ষণ করে। ভেতরে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রাণপণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে পুলিশ লাইনস নিজেদের আয়ত্তে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।
রাত সাড়ে ১০টার সময় ২২তম বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা সমগ্র পিলখানা ইপিআরে পজিশন নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আর পিলখানা ইপিআরে একসঙ্গে আক্রমণ চালায়।
২৫ মার্চ রাতের ১৮তম ও ৩২তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অনিয়মিত বাহিনীর পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, শিক্ষক কোযার্টার, ছাত্রাবাস কর্মচারী কোয়ার্টারে আক্রমণ করে। এই ধাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষকসহ কয়েকশ ছাত্র, কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে।
২৫ মার্চ রাত দেড়টায় তথা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে তাকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয় পরে পাকিস্তানে। শেখ মুজিবুর রহমানকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সৈন্যরা বাড়িতে ঢুকে সব নথিপত্র জব্দ করে। তার বাসায় থাকা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা গুলিতে ভূপাতিত করে দেয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন ‘সার্চলাইট’ নামে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। ২৫ মার্চ গণগত্যা সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘শুধুমাত্র পঁচিশে মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।’
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে ৭ হাজার মানুষকে হত্যা এবং গ্রেপ্তার করা হয় আরও ৩ হাজার।’
দিবসটি পালনে যত আয়োজন
আজ দুপুর ১২টা থেকে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় মিনিপোলসমূহে গণহত্যা বিষয়ক বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। বাদ জোহর বা সুবিধাজনক সময়ে ২৫ মার্চের রাতে নিহতদের স্মরণে সারা দেশের মসজিদে বিশেষ মোনাজাত ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে।
দিবসটি উপলক্ষে ২৫ মার্চ রাত ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত এক মিনিটের প্রতীকী ব্ল্যাকআউট পালন করা হবে। তবে কেপিআই ও জরুরি স্থাপনাগুলো এ কর্মসূচির বাইরে থাকবে। এদিনের রাতে কোনো অবস্থাতেই আলোকসজ্জা করা যাবে না।
এদিন সকাল ১০টা বা সুবিধাজনক সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপনায় দিবসটি উপলক্ষে একটি সেমিনার আয়োজন করা হবে। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস-২০২৬ পালন এবং ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে কালরাত্রি স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্যের বাসভবনসংলগ্ন স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে ‘গণহত্যা দিবস’। বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় মোমবাতি প্রজ্বালন ও শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এই আয়োজন। এরপর সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন এবং সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে শুরু হবে আলোচনা সভা। এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।
এ ছাড়া গণহত্যা দিবস ও কালরাত্রি স্মরণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বুধবার দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করেছে। এর মধ্যে সকাল ১০টায় জাদুঘর অঙ্গনে ঐকতান সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রের সহযোগিতায় শিশু-কিশোররা মুক্তিযুদ্ধের ছবি এঁকে দেয়াল নির্মাণ করবে। বিকাল ৪টায় জাদুঘর মিলনায়তনে Remembering The 1971 Genocide : Memory, Denial and Lessons গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও প্যানেল আলোচনা এবং সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশিত হবে। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে তরুণ গবেষকবৃন্দ এবং সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করবে যথাক্রমে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী ও মুক্তধারা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র । সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জাদুঘরের শিখা চির অম্লান প্রাঙ্গণে কালরাত্রি স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করা হবে।
প্রতি বছরের মতো এবারও গণহত্যা দিবস ও কালরাত্রির স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ। বুধবার বিকাল ৫টায় রায়েরবাজার জাতীয় বধ্যভূমিতে শহীদদের পুণ্য স্মৃতির প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ আয়োজন। পরে কালরাত্রির স্মরণে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে আলোক প্রজ্বালনের কর্মসূচি।

