অস্কারের ইতিহাসে বিতর্কিত ঘটনা
প্রান্তডেস্ক:অস্কার বিজয়ীর তালিকা ঘুরিয়ে দেখলে দেখা যায় যে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত মানের চলচ্চিত্র উপেক্ষিত হয়েছে, আর কিছু কম যোগ্যতাসম্পন্ন চলচ্চিত্র জয়ী হয়েছে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
তবে এই দীর্ঘ ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সব সিদ্ধান্তই প্রশ্নাতীত ছিল না। অনেক সময় এমন চলচ্চিত্র পুরস্কৃত হয়েছে, যেগুলোকে সমালোচকরা তুলনামূলকভাবে দুর্বল মনে করেন আবার অনেক অসাধারণ কাজ উপেক্ষিত থেকে গেছে। এই বিতর্ক শুধু সমালোচকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাধারণ দর্শক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যেও গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরবর্তী সময়েও এমন বিতর্ক বারবার ফিরে এসেছে। ১৯৮৯ সালে ড্রাইভিং মিস ডেইজি পুরস্কার পেলেও ডু দ্য রাইট থিং-এর মতো গভীর সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরা চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ২০০৬ সালে ক্র্যাশ জয়ী হয়, যখন ব্রোকব্যাক মাউন্টেন ছিল আরও শক্তিশালী ও সাহসী একটি কাজ। আবার ২০১৯ সালে গ্রিন বুক সেরা চিত্রের পুরস্কার পায়, যেখানে রোমা বা ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান-এর মতো চলচ্চিত্র অনেকের মতে বেশি প্রাপ্য ছিল।
অন্যদিকে, এমন অনেক চলচ্চিত্র আছে যেগুলো অস্কার না পেলেও সময়ের সঙ্গে ক্লাসিক হয়ে উঠেছে। যেমন শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশন, পাল্প ফিকশন কিংবা গুডফেলাস যেগুলো আজ বিশ্বসিনেমার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
অবশেষে জয়লাভ
অস্কারের ইতিহাসে অনেক অভিনেতা বা নির্মাতা বছরের পর বছর নমিনেশন পেয়েও জয়ের স্বাদ পাননি। এমন গল্পগুলো শুধু হতাশা নয়, বরং ধৈর্য এবং সংগ্রামের। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর কাহিনি এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি টাইটানিকের পর থেকে একাধিকবার সেরা অভিনেতার নমিনেশন পেয়েছিলেন। দ্য অ্যাভিয়েটর, ব্লাড ডায়মন্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট প্রতিবারই তিনি হারিয়েছিলেন। অনেকে বলতেন যে তার জয় হয়তো আর কখনোই আসবে না। কিন্তু ২০১৬ সালে দ্য রেভেন্যান্ট চলচ্চিত্রে তার অসাধারণ অভিনয় অবশেষে সেই জয় এনে দেয়।
বৈচিত্র্যের সমস্যা
অস্কারের ইতিহাসে বৈচিত্র্যের অভাব দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়েছে। ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে অভিনয়ের সব নমিনেশন শ্বেতাঙ্গ অভিনেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি আন্দোলন শুরু হয়, যা ‘অস্কার সো হোয়াইট’ নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাপ্রিল রেইনের মতো সক্রিয়কর্মীরা। স্পাইক লি, জাডা পিংকেট স্মিথসহ অনেক তারকা এই অনুষ্ঠান বয়কট করেন। ফলে অস্কার আয়োজক সংস্থা তাদের সদস্যপদে পরিবর্তন আনে। নারী এবং কৃষ্ণাঙ্গ সদস্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়।
এই আন্দোলনের ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে পরিবর্তন দেখা যায়। ২০১৭ সালে মুনলাইট বিজয়ী হয়, যা কৃষ্ণাঙ্গ এবং সমকামী চরিত্রের গল্পকে সামনে আনে। তারপর প্যারাসাইট প্রথম অ-ইংরেজি চলচ্চিত্র হিসেবে সেরা চিত্র জেতে। কোডা এবং এভরিথিং এভরিওয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স-এর মতো চলচ্চিত্রও বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করেছে। তবে সমস্যা এখনো পুরোপুরি মিটেনি। অনেক সময় এখনো শ্বেতাঙ্গ দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলা হয়। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে চাপ প্রয়োগ করলে পরিবর্তন সম্ভব, কিন্তু এখনো অনেক পথ বাকি।
অস্কারে লিঙ্গবৈষম্য দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। সেরা পরিচালকের বিভাগে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকজন নারী জয়ী হয়েছেন। প্রথমজন ক্যাথরিন বিগেলো, যিনি ২০১০ সালে দ্য হার্ট লকার-এর জন্য পুরস্কার পান। এরপর ক্লোয়ি ঝাও নোম্যাডল্যান্ড-এর জন্য এবং জেন ক্যাম্পিয়নের মতো নির্মাতারা স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে নারী পরিচালকদের নমিনেশনের হার এখনো খুবই কম। সেরা চিত্রের ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় নিরানব্বই বছরের ইতিহাসে নারীদের নমিনেশন মাত্র সতেরো শতাংশের কাছাকাছি।
এই বৈষম্য শুধু পুরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনের দিকেও স্পষ্ট। নারী চিত্রনাট্যকার ও সম্পাদকদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় চলচ্চিত্রের গল্পগুলো প্রায়ই পুরুষদের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত হয়। পরিস্থিতি বদলাতে অস্কার আয়োজক সংস্থা কিছু বৈচিত্র্যভিত্তিক মানদণ্ড চালু করেছে, যাতে নারী এবং অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ে। তবুও অনেক নারী পরিচালক এখনো অভিযোগ করেন যে তাদের কাজ যথাযথ সুযোগ পায় না। এই লিঙ্গবৈষম্য অস্কারকে অনেক সময় পুরনো ধ্যানধারণার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।
রাজনৈতিক বক্তৃতা মঞ্চে
অস্কারের মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া বহু পুরনো একটি প্রথা, যা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ১৯৭৩ সালে মার্লন ব্র্যান্ডো তার সেরা অভিনেতার পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেন। তার পরিবর্তে সাচিন লিটলফেদার নামের এক নেটিভ আমেরিকান নারী মঞ্চে এসে হলিউডে আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্য ও ভুল উপস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলেন। সে সময় এই ঘটনাটি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ও বিতর্কিত মনে হলেও, পরবর্তী সময়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এরপর ১৯৭৮ সালে ভ্যানেসা রেডগ্রেভ প্যালেস্টাইনের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আবারও অস্কারের মঞ্চকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তার বক্তব্য অনেকের সমর্থন পেলেও তীব্র সমালোচনারও মুখে পড়ে, যা প্রমাণ করে যে অস্কারের মঞ্চে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই বিশ্ব জুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
২০০৩ সালে মাইকেল মুর ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, এই যুদ্ধ অন্যায় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার এই বক্তব্য দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে কেউ প্রশংসা করেন, আবার কেউ মনে করেন এটি একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত নয়।
২০১৫ সালে প্যাট্রিসিয়া আরকেট নারীদের সমান মজুরির দাবি তুলে ধরেন। তার বক্তব্য শুধু চলচ্চিত্র জগতেই নয়, বরং বিশ্ব জুড়ে নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে অস্কারের মঞ্চ শুধুমাত্র পুরস্কার গ্রহণের জায়গা নয়; এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিল্পীরা নিজেদের অবস্থান, প্রতিবাদ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশ করতে পারেন। যদিও অনেকে মনে করেন এই ধরনের বক্তব্য অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ফেলে, তবুও বাস্তবে এগুলো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঐতিহাসিক মুহূর্তসমূহ
অস্কারের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা শুধু একটি রাতের ঘটনা নয় বরং বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ২০২২ সালে উইল স্মিথ এবং ক্রিস রকের ঘটনাটি তার সাম্প্রতিক ও সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ক্রিস রক জাডা পিংকেট স্মিথের চুল নিয়ে একটি রসিকতা করেন, যা তার অ্যালোপেশিয়া রোগের কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় উইল স্মিথ মঞ্চে উঠে তাকে চড় মারেন। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি পুরো অনুষ্ঠানকে স্তব্ধ করে দেয় এবং বিশ্ব জুড়ে আলোচনা শুরু হয় কোনো ব্যক্তিগত আঘাতের প্রতিক্রিয়া কি এভাবে প্রকাশ করা উচিত, এবং অস্কারের মতো একটি মঞ্চে এর প্রভাব কী হওয়া উচিত।
আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালে, যা ‘এনভেলপ গেট’ নামে পরিচিত। সে বছর ভুল করে লা লা ল্যান্ডকে সেরা চিত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই জানা যায়, প্রকৃত বিজয়ী ছিল মুনলাইট। এই ভুল ঘোষণার কারণে মঞ্চে এক অস্বস্তিকর ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ভুল সংশোধন করা হলেও, এই ঘটনা অস্কারের ইতিহাসে একটি বড় ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে এবং আয়োজনের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এরও অনেক আগে, ১৯৪০ সালে হ্যাটি ম্যাকড্যানিয়েল প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জয় করেন। সেই সময় বর্ণবৈষম্য ছিল তীব্র, এবং তার এই জয় ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং একটি সামাজিক বাধা ভাঙার প্রতীক। তবে পরিহাসের বিষয়, পুরস্কার গ্রহণের সময় তাকে আলাদা করে বসতে হয়েছিল যা সেই সময়ের বৈষম্যের বাস্তবতাকেই সামনে তুলে ধরে।


