প্রান্তডেস্ক:ইরানের সাম্প্রতিক ভয়াবহ মিসাইল ও ড্রোন হামলায় দোহা, দুবাই এবং মানামার মতো ঝকঝকে শহরগুলোর আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের এই স্থিতিশীল দেশগুলোকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শনি (২৮ ফেব্রুয়ারি) ও রোববার (১ মার্চ) ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান যে প্রতিশোধমূলক পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে, তার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান। এই হামলার ফলে ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ‘নিরাপদ স্বর্গ’ হিসেবে পরিচিতি আজ প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এক ‘অসম্ভব’ সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে; হয় তাদের এই হামলার মুখে নিষ্ক্রিয় থাকতে হবে, নতুবা পাল্টা আঘাত হেনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় অন্তত ৩ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও কাতারে ১৬ জন, কুয়েতে ৩২ জন এবং ওমান ও বাহরাইনে আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। দুবাইয়ের ল্যান্ডমার্ক ভবন ও বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েত বিমানবন্দরে মিসাইল বা ইন্টারসেপ্টর ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির অধ্যাপক মনিকা মার্কস আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে, দোহা বা দুবাইয়ের মতো শহরে বোমা পড়ার ঘটনাটি আমেরিকানদের কাছে মায়ামি বা সিয়াটলে হামলার মতোই অকল্পনীয় এবং বিস্ময়কর। এই হামলার মাধ্যমে ইরান মূলত তার প্রতিবেশীদের জিম্মি করার কৌশল নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
কূটনৈতিক দিক থেকে এই যুদ্ধ থামানোর জন্য ওমান এবং অন্যান্য দেশগুলো গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি এক সময় শান্তি ‘হাতের নাগালে’ বলে ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতর্কিত হামলা সব প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের লেকচারার রব জিস্ট পিনফোল্ডের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করা তাদের অভ্যন্তরীণ বৈধতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নিজেদের জনগণের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা হয়তো শেষ পর্যন্ত অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হবে। সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি ইসরায়েলকে সহায়তার বদলে ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’ বা নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একক বা যৌথভাবে লড়াইয়ে নামতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো তাদের অবকাঠামোর নাজুকতা। বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি শোধন প্ল্যান্ট এবং জ্বালানি অবকাঠামো আক্রান্ত হলে প্রচণ্ড গরমের এই মরু দেশগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এর বাইরে তাদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পর্যটন ও বিনিয়োগবান্ধব ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইরান যেভাবে লক্ষ্যহীনভাবে মিসাইল ছুড়ছে, তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রক্সি যুদ্ধের বদলে এখন মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি ‘রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র’ যুদ্ধের এক নতুন এবং বিপজ্জনক যুগ শুরু হয়েছে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে এই অঞ্চলটি ধ্বংসের দিকে যাবে নাকি শান্তির কোনো পথ খুঁজে পাবে।
সূত্র: আল জাজিরা