একসময় আরএসএস করতেন নাথুরাম, তাঁর গুলিই কেড়ে নিল মহাত্মা গান্ধীর প্রাণ

সাইফুল সামিন : শান্তি, মুক্তি ও মানবতার প্রতীক তিনি। আমৃত্যু এই নীতিতে অটল থেকেছেন। অহিংস পথে ব্রিটিশবিরোধী নিরলস লড়াই–সংগ্রাম করেছেন। বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারাভোগ করেছেন। জীবনভর তাঁর এই সংগ্রাম তাঁকে করে তোলে অনন্য। তাঁর নামযশ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।
খুবই সাদামাটা, অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আধ্যাত্মিক এই মানুষটির নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তবে তিনি ‘মহাত্মা গান্ধী’ নামেই বহুল পরিচিত। ‘মহাত্মা’ শব্দের অর্থ ‘মহান আত্মা’। ভালোবাসা ও সম্মানের জায়গা থেকে অনেকে তাঁকে ‘বাপু’ (বাবা) বলেও সম্বোধন করতেন।
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তবে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ছয় মাসের কম সময়ের ব্যবধানে নৃশংস এক গুপ্তহত্যার শিকার হন এই শান্তিকামী নেতা।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্ম ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর। ব্রিটিশশাসিত ভারতের পোরবন্দরের একটি অভিজাত হিন্দু পরিবারে। তাঁর জন্মস্থান এলাকাটি এখনকার ভারতের গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত।
বাবা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী। তিনি ছিলেন পোরবন্দরের রাজদেওয়ান (মুখ্যমন্ত্রী)। তিনি ছিলেন নীতিমান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি।
মা পুতলিবাই গান্ধী। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। ছেলের চরিত্র গঠনে তাঁর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি ছেলের মধ্যে ধর্মীয় নীতি–নৈতিকতার সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন। নিরামিষ ভোজন, ধর্মীয় সহনশীলতা, সহজ–সাধারণ–সংযমী জীবনযাপন, অহিংসার মূল্যবোধ তিনি ছোটবেলা থেকেই ছেলের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন।
মহাত্মা গান্ধী মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা–বাবার পছন্দে ১৪ বছর বয়সী কস্তুরবা মাখাঞ্জিকে বিয়ে করেন। ১৮ বছর বয়সে, ১৮৮৮ সালে আইনশাস্ত্র পড়তে মহাত্মা গান্ধী লন্ডনে যান। ১৮৯১ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেন।
লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে মহাত্মা গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। তিনি আইনজীবী হিসেবে পেশা শুরু করেন। তবে প্রথম মামলাতেই তিনি হেরে যান। তিনি অপমানিত হন। একপর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তাব পান তিনি। এই প্রস্তাব তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক দীক্ষা
১৮৯৩ সালে মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে ভারত ছাড়েন। পরবর্তী ২১ বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটে তাঁর। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। দেশটিতে ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি সাধারণভাবে প্রচলিত বৈষম্যের শিকার হন তিনি। এ আচরণে তিনি হতবাক হন। বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি এই আচরণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত ভারতীয় অভিবাসীদের অধিকার আদায়ে মহাত্মা গান্ধী সোচ্চার হন। ১৮৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করেন নাটাল ভারতীয় কংগ্রেস। এই কংগ্রেস সংগঠিত আন্দোলনের মঞ্চ তৈরি করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরেই বিকশিত হয় অহিংস আন্দোলন ‘সত্যাগ্রহ’।
অহিংস আন্দোলন করতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধী একাধিকবার গ্রেপ্তার হন, কারাবরণ করেন। তবু তাঁর সংকল্প ছিল অনড়। নৈতিক শক্তি ছিল দুর্বার। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালেই তাঁর সংগ্রাম ও চিন্তাধারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানকালে ১৯০৬ সালে ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন মহাত্মা গান্ধী। এর পর থেকে ব্রহ্মচর্য পালনে তিনি আরও কঠোর হতে শুরু করেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন—উভয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।


