জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ভারতে ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট, নোয়াখালি (বর্তমান ফেনী) জেলার মজুপুর গ্রামে। পিতৃদত্ত নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। পিতা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক আর মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন গৃহিণী। জহির রায়হান পিতার কর্মসূত্রে চল্লিশের দশকে কলকাতা মডেল স্কুল, মিত্র ইনস্টিটিউশন ও আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। শৈশবেই অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের প্রভাবে বামপন্থী রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। কমিউনিস্ট পার্টির কুরিয়ার হিসেবে সদস্যদের মধ্যে চিঠিপত্র ও খবর আদান-প্রদানের গোপন কাজ ছিল তাঁর, প্রকাশ্যে বিক্রি করতেন পার্টির মুখপত্র স্বাধীনতা। মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৯৪৫ সালে তিনি কলকাতায় ‘ভিয়েতনাম দিবসে’র মিছিলে যোগদান করেন এবং পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৫০ সালে নোয়াখালির আমিরাবাদ হাইস্কুল থেকে প্রথম শ্রেণিতে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে জগন্নাথ কলেজে আইএসসিতে ভর্তি হন।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও গোপন রাজনীতির প্রতি অনুরক্ত জহিরুল্লাহ বাবার ইচ্ছানুসারে ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলেও পরে পুনঃভর্তি হন বাংলা বিভাগে। এ-সময়েই প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন তিনি এবং কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করেন। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে নব-সৃষ্ট পাকিস্তানে তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। পার্টির সদস্যদের তাই গোপনে কাজ করতে হতো। অতএব পার্টির নেতা কমরেড মণি সিংহ তাঁর ছদ্মনাম রাখলেন ‘রায়হান’। পরবর্তীকালে জহিরুল্লাহ নিজের নাম সংক্ষিপ্ত করে সঙ্গে রায়হান যোগ করে হয়ে গেলেন ‘জহির রায়হান’। এই রূপান্তরিত জহির রায়হান ১৯৫৭-৫৯ সময়পর্বে হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সংস্কৃতি সংসদে’র সভাপতি। পরবর্তীকালে এই নামেই তিনি তুখোড় সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে সাধারণ্যে পরিচিতি লাভ করেন। ষাটের দশকে তিনি ইংরেজি সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস এবং বাংলা মাসিক পত্রিকা প্রবাহ সম্পাদনা করতেন।
বিশ শতকের ষাটের দশকে জহির রায়হান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একজন রাজনীতি-সচেতন সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক নেতা হিসেবে ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তখন বাংলা হরফের বদলে উর্দু হরফে বাংলা ভাষা চালুর পাঁয়তারা করছিল। ১৯৬৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলা বর্ণমালা ও বানান সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এই পরিকল্পিত পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ করে জহির রায়হানসহ ৪১ জন বুদ্ধিজীবী বিবৃতি দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্বে, ১৯৬৯ সালে ১১ দফার মিছিলে গুলি চালিয়ে ছাত্র ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি, শিল্পী ও চলচ্চিত্রকাররা লিখিতভাবে যে-প্রতিবাদ জানান, জহির রায়হান সেই লিখিত বিবৃতিতেও স্বাক্ষর করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে তিনি ডাকসুর নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের মার্চে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজে’র ব্যানারে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার শপথ নেন।
সাহিত্যিক জহির রায়হান
ভাষা-আন্দোলনের গভীর প্রভাব পড়েছিল জহির রায়হানের সাহিত্যকর্মে। তাঁর প্রথম উপন্যাস শেষ বিকেলের মেয়েসহ (১৯৬০) তৃষ্ণা (১৯৬২), হাজার বছর ধরে (১৯৬৪), আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯), একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৭০), আর কতদিন (১৯৭০), মহামৃত্যু, একুশের গল্প ও অন্যান্য সাহিত্যকর্মে এ%8


