প্রধান উপদেষ্টাকে অ্যামনেস্টি সেক্রেটারি জেনারেলের চিঠি ::নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখার আহ্বান

ক্যালামার্ড আরও লিখেছেন, অতীতে ধারাবাহিক সরকারগুলোর অধীনে বাংলাদেশে গুরুতর ও ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকারে বিধিনিষেধ এবং সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। এসব লঙ্ঘন ঘটেছে সংকুচিত নাগরিক পরিসর, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় কর্মীদের দায়মুক্তির প্রেক্ষাপটে।
নির্বাচনের আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা-যা আইসিসিপিআর-এর ১৯, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্রগোষ্ঠী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনসহ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর ভয়, নজরদারি, হয়রানি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই কথা বলা, সংগঠিত হওয়া ও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার সক্ষমতা অবাধ ও সচেতন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য অপরিহার্য। এই মৌলিক স্বাধীনতাগুলোর ওপর বিধিনিষেধ জনআলোচনাকে ক্ষুণ্ন করে, নির্বাচনী পরিবেশ বিকৃত করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই আইন, নীতি ও চর্চার মাধ্যমে এসব অধিকার পূর্ণভাবে সুরক্ষিত করা এবং কেউ যেন নিজের অধিকার চর্চার কারণে গ্রেপ্তার, ভীতসন্ত্রস্ত বা আক্রান্ত না হয় তা নিশ্চিত করা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ করে সন্ত্রাস দমন আইন (এটিএ), সাংবাদিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সংশ্লিষ্টতার কারণে লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ওইসব আচরণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের লঙ্ঘন। উদাহরণস্বরূপ, ২৮ আগস্ট সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। একদিন আগে একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন তিনি। তাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থক ও অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। একইভাবে ১৫ই ডিসেম্বর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে এটিএ’র আওতায় আটক করা হয়। আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন আছে এ কারণে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমন ধারণার ভিত্তিতে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার অংশ।
২০২৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর কিছু বিক্ষোভ, সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে আগুন দেয়, ছায়ানট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালানো হয়। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবিরকে হয়রানি করা হয়। একই সময়ে গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। এসব ঘটনা জীবন, ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় চরম ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
এগুলো ২০২৫ সালে রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীর হাতে সাংবাদিক, সংখ্যালঘু ও শিল্পীদের ওপর হামলার একটি নথিভুক্ত ধারাবাহিকতার অংশ। বাংলাদেশ শুধু অপরাধীদের তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনতেই বাধ্য নয়, বরং বেসরকারি পক্ষের হামলা প্রতিরোধ করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সহিংসতার মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিলম্বিত ও অকার্যকর প্রতিক্রিয়া কর্তৃপক্ষের মানবাধিকার দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থতাই প্রতিফলিত করে।
তিনি আরও লিখেছেন, এই প্রেক্ষাপটে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তর্বর্তী সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে- আসন্ন নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবাধিকার সুরক্ষাকে রাখতে। এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা আইন অপব্যবহার বন্ধ করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুত ও আইনানুগভাবে অধিকার চর্চাকারীদের সুরক্ষা দেয় তা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে সময়টি অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতির একটি পরীক্ষা। এখন নেয়া সিদ্ধান্তগুলো আগামী বহু বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার গতিপথ নির্ধারণ করবে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হবে। যাতে বাংলাদেশের সকল মানুষ স্বাধীনভাবে, নিরাপদে এবং ভয়হীনভাবে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিতে পারে।

