সর্বশেষ সংবাদ
ঈদের ছবি নিয়ে হিসাব-নিকাশ এখনো মিলছে না  » «   ১১ প্রশ্নে ৮২ ভুল!  » «   মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল : আরেকটা হাতছানি  » «   ২ সেপ্টেম্বর শাবিতে ভর্তির আবেদন শুরু  » «   এ্যাকশনে পুননির্বাচিত আরিফ  » «   ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি  » «   সমকাল সম্পাদককে শেষ শ্রদ্ধা  » «   অনবদ্য তামিম ইকবাল  » «   ওরা এখনো নজরকাড়া  » «   শাবিপ্রবি’র হল বন্ধ  » «   সিলেটে ২১ আগষ্ট থেকে ৫ দিন বন্ধ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ  » «   ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «  

‘‌লালন ফকিরের চেয়ে বড় রকস্টার আমি দেখিনি : কৌশিক চক্রবর্তী



foxপ্রান্তডেস্ক:বাড়ির দোরগোড়ায় নেমপ্লেটে বড়বড় করে লেখা ‘‌উডস্টক’‌। ঘরে ঠাসা বই। তারমধ্যেই বসে আড্ডা দিচ্ছেন। আবার প্রয়াত সতীর্থ গিটারিস্টের প্রসঙ্গ উঠলে চোখ ভিজে যাচ্ছে। গান নিয়ে তো বটেই, পাশাপাশি তাঁর সাঙ্গীতিক দর্শন নিয়ে জানালেন পশ্চিম বঙ্গের জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ‘‌পৃথিবী’‌র ভোকালিস্ট কৌশিক চক্রবর্তী।
❏‌ ২০০৫ ‘‌ব্যান্ড–এ–মাতরম’‌–এ দ্বিতীয়। আর এখন ২০১৮। এই দীর্ঘ সময়ে কতটা পাল্টেছো?‌
কৌশিক:‌ মানুষ হিসাবে খুব একটা পাল্টাইনি। একই রকম আবেগপ্রবণ। একই রকম অস্থিরমতি। চট করে রেগেও যাই, ভুলেও যাই। তবে শিল্পী হিসাবে অনেকটা পাল্টেছি। সময়ের সঙ্গে পাল্টাতে না পারলে পিছনে পড়ে যেতে হবে। আমি বিশ্বাস করি মিউজিক যত না বেশি করার, তার থেকে বেশি চিন্তা করার। সেই ‘‌থটপ্রসেস’‌–টা পাল্টেছে বই কী!‌ ২০০৫ সালের ওই সময়টায় আমরা একটু ব্যালাডধর্মী গান বানাতাম। যেমন ‘‌ও আমার’ কিংবা ‘‌নষ্ট’‌‌!‌ যত সময় গিয়েছে আমরা ততই ওই ক্লাসিক্যাল রক থেকে অল্টারনেটিভ রকের পথে হেঁটেছি।
❏‌ ক্লাসিক রকের তো একটা চিরন্তন আবেদন আছে। তাহলে সেটার থেকে সরে আসছো কেন?‌
কৌশিক:‌ একেবারে কিন্তু সরে আসিনি। তবে ব্যালাডধর্মী ক্লাসিক রক মিউজিক আমরা কিন্তু এখনও করি। তবে পরিমাণটা কমেছে। চ্যাপ্টার থ্রি অ্যালবামের ‘‌জন্মদিন’‌ এবং ‘‌চলো উড়ে যাই’‌ গান দুটোর মধ্যেও কিন্তু ওই ক্লাসিক রকের প্রভাব রয়েছে। আসলে মানুষ এখন গান শুনতেও পরিশ্রম করতে চায় না। তাই শুধু আমরা নয়, সব ব্যান্ডই নিজেদের সাউন্ডকে সহজ থেকে সহজতর করেছে।
শুধু সাউন্ড নয়, লিরিকের দিক থেকেও অনেকটা সহজ হয়েছি আমরা।
❏ তাহলে আগে ব্যান্ডের গান আরও অনেক কঠিন ছিল বলছেন?‌
কৌশিক:‌ আমি একটা উদাহরণ দিতে পারি। ফসিল্‌সের প্রথম অ্যালবামে ‘‌দেখো মানসী’‌ গানটার লিরিক কিন্তু খুব সহজ নয়। এখন ‘‌জানলা’‌ ‌শোনার পরে মনে হচ্ছে আমরা এখন খুব সহজ ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করার চেষ্টা করছে।
❏‌ কাভার মিউজিকের যুগেও পৃথিবী নিজেদের গান ছাড়া অন্য কারও গান গায় না বললেই চলে। রহস্যটা কী?‌
কৌশিক:‌ সত্যি কথা বলতে শুরুর দিকে আমাদের খুব বেশি নিজেদের গান ছিল না। সেই কারণে একটা একঘণ্টা বা দেড়ঘণ্টার শো করার জন্যই কাভার সং করতে বাধ্য হতাম। তবে কলকাতার কোনও ব্যান্ডের গান আমরা কাভার করতাম না। এখন আমাদের ঝুলিতে যথেষ্ট ‘‌অরিজিনাল কম্পোজিশন’‌ রয়েছে। এখন আর কাভার গাইতে হয় না।
❏‌ বাংলা ব্যান্ডের জগতে একটা চালু অভিযোগ, নতুন বা উঠতি ব্যান্ডদের হিন্দি গান গাইতে জোর করেন আয়োজক, উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে কী বলবে?‌
কৌশিক:‌ আমি তো এসব ক্ষেত্রে আমি আমার ছাত্রদের একটা দুষ্টু বুদ্ধি দিই। বলি, আয়োজকদের বলবি, হ্যাঁ হিন্দি গাইব। কিন্তু স্টেজে উঠে আর গাইবি না। দেখাই যাক না হিন্দির বদলে ভাল অরিজিনাল কম্পোজিশন শোনালে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়। আর্টিস্ট ম্যানেজাররা বাংলার বাজারে হিন্দি শিল্পীদের এনে এনে ভাল বাংলা গান শোনানোর রেওয়াজটাই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আমি তো নতুন ব্যান্ডদের বলব, দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে থাকো। গানে দম থাকলে ফল মিলবেই। কাভার গাইতে থাকলে নিজেদের পরিচিতিটাই হারিয়ে যাবে। আমরা যাদের মনে রেখেছি, তাদের নিজেদের গানের জন্যই মনে রেখেছি। কে কী কাভার গেয়েছেন, সেটা দিয়ে মনে রাখিনি।
❏‌ ২০০৩–০৫ সালের কথা বলছি।
তখন বাংলা ব্যান্ডের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল, এখানে গায়করা নাকি সুরে গান করেন না। একজন ব্যান্ডের গায়ক হিসাবে কী মনে হয়?‌ অভিযোগটা কি ঠিক?‌
কৌশিক:‌ কখনও ঠিকভুল সেভাবে বিচারই করিনি। তখন আমার বয়স কম ছিল। তখন ব্যান্ড করা মানেই মনে হতো বিরাট উন্মাদনার কোনও একটা কাজ করছি। সমসাময়িক ব্যান্ডগুলো আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। এতটাই বন্ধু ছিলাম আমরা, যে সুর–বেসুর বিচার করে দেখিনি। তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল গানের বিষয়বস্তুটা। তবে খুব বেসুরে কেউ গাইলে সেটা কানে লাগত।
❏‌ এখন তোমরা সিনিয়র ব্যান্ড। পরবর্তী প্রজন্মের ব্যান্ডগুলোকে দেখে–শুনে কী মনে হচ্ছে?‌
কৌশিক:‌ এখন তরুণ প্রজন্মের মিউজিশিয়ানরা অনেক বেশি ‘‌সিরিয়াস’‌। তারা অনেক ভেবেচিন্তে পা ফেলে। আমরা তো স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। ভাবিনি স্রোতটা কোন দিকে যাচ্ছে। তাদের কাজের গুণগত মান দেখে লজ্জা লাগে মাঝেমাঝে, কেন আমরা এই মানের কাজ শুরুর দিকে করতে পারিনি।
❏‌ তোমাদের সময় ইন্টারনেট–ইউটিউব এত বেশি পরিমাণে ছিল না। সেটাও কি একটা কারণ নয়?‌
কৌশিক:‌ হ্যাঁ, সেটাও একটা কারণ। তাই বলে এই প্রজন্মের শিল্পীদের কৃতিত্ব কোনওমতেই ছোট করে দেখা যায় না। এটা আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি, আগামী প্রজন্মকে নিজেদের গান গাইতে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
❏‌ তুমি তো বাংলা রকের পাশাপাশি ফোক নিয়েও কাজ করছো। একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, বাংলা ফোকে নাকি বিদেশি যন্ত্রানুসঙ্গ ঢুকি ফোকের বিশুদ্ধভাবটাই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটা কতটা মানো।
কৌশিক:‌ ব্যান্ড মিউজিকের যে দর্শনে আমরা বিশ্বাস করি, বাংলার লোকসঙ্গীতও সেই একই ধারার দর্শনে বিশ্বাস করে। আমার মতে লালন ফকির তো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রকস্টার। কারণ বাংলা লোকগান, বাংলা ব্যান্ড মিউজিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কথা বলে।
যে কোনও ফর্ম্যাটের মিউজিকেই পরীক্ষা–নিরীক্ষা হওয়াটা কাম্য। কারণ এই পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমেই যে কোনও ফর্ম্যাটের মিউজিক এগিয়ে চলে। নতুন রূপ পায়, নতুন জানলা খুলে যায়। তবে নতুন যে ব্যান্ডগুলো ফোক মিউজিক করছে, তাদের বেশির ভাগই চারপাঁচটা গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চর্চাটা বাড়াতে হবে। গান শোনা, গান চর্চার ব্যাপ্তিটাও বাড়াতে হবে। শুধু লালন নয়, হাসন রাজা, মুর্শিদী গান, আসমৎ ফকির, শাহ আবদুল করিম, বিজয় সরকার, ফৈজুল ফকিরদের গান শুনতে হবে। বাংলার উপজাতিদের গান শুনতে হবে। তবেই না আসল ফোক চর্চা হবে। এদের সঙ্গে থাকতে হবে, খেতে হবে, ঘুমোতে হবে, এদের মতো ভাবতে হবে। সেটা আমরা করেছি। এই প্রসঙ্গে ঈশানের সায়নের (‌সায়ন মিত্র)‌ কথা বলব। ওরাও কিন্তু কয়েকদিন আগে শাহ আবদুল করিমের গান গেয়েছিল। আমার এই পদক্ষেপটাকে খুব সাহসী বলে মনে হয়েছিল। সায়ন কাজের কাজ করেছে। তবে একথা মানতেই হবে, পরিচিত গানও ব্যান্ড স্ট্রাকচারে পড়ে লোকগানের গ্রহণযোগত্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেড়েছে।
❏ তোমাদের ব্যান্ডের প্রয়াত গিটারিস্ট বুবুন‌কে কতটা মিস্‌ করো?‌
কৌশিক:‌ ঘরের মানুষ চলে গেলে যতটা ধাক্কা লাগে, ততটাই ধাক্কা খেয়েছিলাম। পৃথিবী অনেকটা পথ হেঁটেছে। আজ ‘‌চ্যাপ্টার থ্রি’‌ রিলিজ করে গেল। অনেকে শুনছেন। ভাল প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। বুবুনদা যে এই দিনটা দেখতে পেল না, সেটা আমার নিজের কাছে একটা বিরাট অপ্রাপ্তি। বুবুনদাকে পাওয়াটা আমার জীবনে একটা বিরাট প্রাপ্তি ছিল। এখনও মনে হয় ঘরের ওই কোণটায় বুবুনদা বসে আছে। চোখ বুজলেই দেখতে পাবো। চলে যাওয়ার খবরটা যখন পাই, তখন খুব রাগ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, বুবুনদা এত কিছু আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিত, আর জীবনের একটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে গেল!‌
❏‌ পৃথিবীর পরবর্তী কাজ কী?‌
কৌশিক:‌ অ্যালবামের পরিকল্পনা সেভাবে নেই।
সিঙ্গলস হিসাবে কিছু গান প্রকাশ করব। ‘‌‌জন্মান্তর’‌ বলে একটা গান আসছে। চ্যাপ্টার থ্রি–র মিউজিক ভিডিও মানুষ চাইছেন। সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। এসভিএফ থেকে আমাদের মিউজিক ভিডিও করতে চেয়েছিল। কিন্তু আশা অডিও কপিরাইট ছাড়তে রাজি হয়নি। তবে এসভিএফ–কে ধন্যবাদ, তারা আমাদের ওপরে ভরসা রেখেছে। তারা জানিয়েছে, আমাদের সঙ্গে তারা কাজ করবে। ভাব

❏‌ চ্যাপ্টার থ্রি–র জুকবক্সের এক লক্ষ ভিউ হয়ে গেল। সেটা নিয়ে তোমাকে খুব উচ্ছ্বসিত দেখেছিলাম।
কৌশিক:‌ একবছরেরও কম সময়ে এই অসাধ্যসাধন হয়েছে। আজ যদি এটা কোনও মুম্বইয়ের শিল্পীর বাংলা গানে হতো, চারদিকে সাড়া পড়ে যেত। কিন্তু আমাদের বেলায় কেউ জানেই না। অবশ্য আশা অডিওকে এই নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই। বরং ওদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কারণ ব্যান্ড–এ–মাতরমের সময় রানার আপের অ্যালবাম রিলিজ করার কথাই ছিল না। সেটা ওরা করেছিলেন। এটা ‌কখনওই ভুলব না।
❏ ‘‌আগুনপাখির গপ্প’‌ করার আইডিয়াটা কী করে মাথায় এল?‌
কৌশিক:‌ আমরা বছরের শেষে সকলে একসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে দেখলাম শ্রোতাদের কিছুই নতুন দেওয়া হয়নি। তখন বিভিন্ন সময়ের ফুটেজ জুড়ে জুড়ে এই ডকুমেন্টরিটা বানানো। আমার ফিল্ম মেকিংয়ের দিকে একটা ঝোঁক আছে। তাই ফুটেজ সংগ্রহ করে রাখি। এই কাজে আমাকে সাহায্য করে আমার ভাই শুভম চক্রবর্তী। সেগুলো সৌমাল্য মল্লিক সম্পাদনা করে এই গোটা ‘‌আগুনপাখির গপ্প’‌ বানানো।
❏‌ সংগঠিক ফ্যান ক্লাব থাকা কতটা দরকার বলে মনে করো?‌
কৌশিক:‌ অবশ্যই থাকা উচিত। ব্যান্ড সম্প্রদায়ের স্বার্থেই থাকা উচিত। তবে ফ্যানক্লাব মানে এটা নয় যে সে সেখানে শুধু আমাদের গানই শুনতে হবে। আমি চাই আমাদের ফ্যানক্লাবের সদস্যরা সব ব্যান্ডের গান শুনুক। সেটা তাদের শ্রোতা হিসাবে আরও পরিণত করবে। তাতে লাভ আমাদেরও।
সুত্র : আজকাল

Developed by: