সর্বশেষ সংবাদ
ঈদের ছবি নিয়ে হিসাব-নিকাশ এখনো মিলছে না  » «   ১১ প্রশ্নে ৮২ ভুল!  » «   মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল : আরেকটা হাতছানি  » «   ২ সেপ্টেম্বর শাবিতে ভর্তির আবেদন শুরু  » «   এ্যাকশনে পুননির্বাচিত আরিফ  » «   ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি  » «   সমকাল সম্পাদককে শেষ শ্রদ্ধা  » «   অনবদ্য তামিম ইকবাল  » «   ওরা এখনো নজরকাড়া  » «   শাবিপ্রবি’র হল বন্ধ  » «   সিলেটে ২১ আগষ্ট থেকে ৫ দিন বন্ধ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ  » «   ইকুয়েডরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত  » «   ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করা অত্যন্ত সহজ!  » «   সারা’র রুপে মুগ্ধ সবাই  » «   আবারও সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু কাপ  » «  

মূল্যস্ফীতির অর্থনীতি



foxড. সায়মা হক বিদিশা:সাধারণভাবে বলতে গেলে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ মূলত চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্যতা। তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, মূল্যস্ফীতি মূলত দুই ধরনের। ১. চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি (demand pull inflation): যখন কোনো দ্রব্যের চাহিদা জোগানের তুলনায় বেড়ে যায়, তখন দ্রব্যমূল্য বাড়তে পারে, যেমন— কোনো বিশেষ মৌসুমে কোনো দ্রব্যের চাহিদা যদি বেড়ে যায়। ২. খরচজনিত মূল্যস্ফীতি (cost push inflation): উৎপাদন খরচ কোনো কারণে বেড়ে গেলে যদি জোগান ব্যাহত হয় কিন্তু চাহিদা একই থাকে, তখন মূল্যস্ফীতি হতে পারে— দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের কোনো কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কিংবা মুদ্রাস্ফীতির (কিংবা দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হলে) কারণে আমদানি করা পণ্যের (যেমন আমদানিকৃত চাল) দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি হতে পারে। অনেক অর্থনীতিবিদ অবশ্য মূল্যস্ফীতি চাহিদা ও খরচ উভয়ের সমন্বয়েই হতে পারে বলে মনে করেন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান ও তার অনুসারীরা মূল্যস্ফীতির মূল উৎস অর্থের চাহিদা ও জোগানকেন্দ্রিক বলে মনে করেন। সহজভাবে বলতে গেলে, অর্থের প্রবৃদ্ধিই মূলত মূল্যস্ফীতির জন্ম দেয় এবং অর্থনীতিতে টাকার সঞ্চালন বেড়ে গেলে দ্রব্যের চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। তাই প্রবাসীদের টাকা পাঠানো বেড়ে গেলে বৈদেশিক রফতানি বাড়ার কারণে কিংবা ব্যক্তিখাতে ঋণের প্রবাহ বাড়লে অর্থাৎ অর্থনীতিতে টাকার সঞ্চালন বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি হতে পারে। এছাড়া অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের (necessity commodity) মূল্য স্থিতিস্থাপকতা কম হওয়ার ফলে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও সেভাবে পণ্যের চাহিদা কমে না, যা কিনা বিলাসদ্রব্যের (luxury commodity) ক্ষেত্রে ঘটে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা মূল্যস্ফীতি হওয়া অস্বাভাবিক না তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যাতে স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে, সেদিকে নজর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। এ প্রসঙ্গে অবশ্য আমাদের মনে রাখতে হবে, ঠিক কোন দ্রব্যটির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আমরা কথা বলছি, সে কারণে চাল কিংবা বাসস্থানের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি কাঁচামরিচ কিংবা বেগুনের মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রথমোক্ত দ্রব্যগুলো ভোক্তার ব্যয়ের অনেকাংশ জুড়ে থাকে এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কিন্তু শেষোক্ত দ্রব্যগুলোর পেছনে ভোক্তা খুব কম অর্থই ব্যয় করে।

এসব তাত্ত্বিক কারণের বাইরে, আমাদের দেশের মতো দেশগুলো যেখানে বাজার ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করে না, সেসব ক্ষেত্রে আড়তদার, মিল মালিক, পাইকারি বিক্রেতা ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগী চাহিদা ও জোগানের সাময়িক ভারসাম্যহীনতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। বিক্রেতারা কখনো কখনো নিজেদের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, যা বাজারের স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিকে ব্যাহত করতে পারে। প্রতিযোগিতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, কয়েকটি বড় বিক্রেতা যখন কলুসিভ কর্মকাণ্ডের (collusive practice) মাধ্যমে কার্টেল (cartel) তৈরি করে, তখন তারা মজুদ বৃদ্ধি কিংবা যোগসাজশের ভিত্তিতে দাম পূর্বনির্ধারণের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কোনো দ্রব্যের চাহিদা বাড়ার আগাম সম্ভাবনা (যেমন— রমজানের সময় পেঁয়াজের চাহিদা বাড়া) কিংবা জোগান কম হওয়ার আশঙ্কা (উচ্চ শুল্কের কারণে ব্যক্তিখাতে চালের কম আমদানি) থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, পরবর্তীতে দাম বাড়বে এ সম্ভাবনায় আড়তদার, বড় কৃষক বা বিক্রেতারা আগাম মজুদ করে রাখে, যা জোগানের স্বল্পতা তৈরি করে। সার্বিকভাবে বলা যেতে পারে যে, মাঠপর্যায়ে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত জোগান দড়ির (supply chain) বিভিন্ন অংশে বিদ্যমান প্রতিনিধি/এজেন্ট দ্রব্যের বিদ্যমান মজুদ, সরকারের ঘোষিত/সম্ভাব্য অঘোষিত নীতি, ভবিষ্যৎ চাহিদার সম্ভাব্য অনুমান ইত্যাদি তথ্য কাজে লাগিয়ে অনেক সময়ই জোগানকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ ভাষায় এসব কর্মকাণ্ডকে বলা হয় সিন্ডিকেট (syndicate)।
প্রায়োগিক দিক থেকে মূল্যস্ফীতি সাধারণত কোনো একটি সূচকের পরিবর্তনের মাধ্যমে মাপা হয় এবং এক্ষেত্রে ‘ভোক্তা মূল্যসূচক’ (Consumer Price Index) সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়— এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত দ্রব্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্বনির্ধারিত খাদ্য ঝাঁপির মূল্যমানের পরিবর্তনের মাধ্যমে মাপা হয়। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভোক্তা মূল্যসূচক গণনায় ব্যবহূত পণ্যগুলোকে আটটি ভাগে ভাগ করা যায়: (১) খাদ্য, পানীয় ও তামাকজাত দ্রব্য (২) পোশাক ও পাদুকা (৩) বাড়ি ভাড়া, জ্বালানি ও আলোক সংক্রান্ত খরচ (৪) আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির খরচ (৫) স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচ (৬) যানবাহন ও যাতায়াত সংক্রান্ত ব্যয় (৭) বিনোদন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত খরচ (৮) বিবিধ পণ্য ও সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যয়। ভোক্তা মূল্যসূচক গ্রাম ও শহরের জন্য আলাদাভাবে হিসাব করা হয় এবং গ্রামের ক্ষেত্রে ৩১৮টি ও শহরের ক্ষেত্রে ৪২২টি পণ্য এক্ষেত্রে হিসাবে নেয়া হয়। জাতীয় পর্যায়ের সূচক গ্রাম ও শহরের সূচকের সমন্বয়ে গঠিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ ভোক্তা মূল্যসূচকের পরিবর্তনের হার কয়েক বছর থেকে মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন এবং গত ডিসেম্বরে (ডিসেম্বর ২০১৬/১৭) পূর্ববর্তী ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি রেকর্ড করা হয়েছে, যা মূলত খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম কমার কারণে হয়েছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ভোক্তা মূল্যসূচক হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত সূচকের প্রায় সব পণ্যেরই দাম পড়তির দিকে ছিল। এর কারণ হিসেবে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের নিম্নগতি, রফতানি খাতে মন্দা, অর্থের সরবরাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কারণে সার্বিক চাহিদার (aggregate demand) ধীরগতিকে মনে করা যেতে পারে। অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে চাহিদাজনিত কারণে ভোক্তা মূল্যসূচকের নিম্নগামী প্রকৃতি লক্ষ করতে পারি। কিন্তু গত বছরে, সঠিকভাবে বলতে গেলে ২০১৭-এর জানুয়ারি থেকে শুরু করে ভোক্তা মূল্যসূচকের ক্রমবর্ধমান গতি-প্রকৃতি দেখা গেছে। গ্রাম ও শহর উভয় অঞ্চলের ভোক্তারাই এক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছেন— বিশেষ করে গত জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে গ্রামের মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে— ৫ দশমিক ৪১, ৫ দশমিক ৮৮ ও ৬ দশমিক ২১ শতাংশ এবং শহরের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮৬, ৫ দশমিক ৯১ ও ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অক্টোবর থেকে এ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও এখনো গ্রাম পর্যায়ে ৫ দশমিক ৮৪ ও শহরের ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ (ডিসেম্বর ২০১৭) মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।
চিত্র-১-এর দিকে লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে যে, সার্বিক মূল্যসূচকের প্রেক্ষাপটে, কয়েক মাস ধরে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমের দিকে থাকলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগের বছরগুলোর বিবেচনায় বেশ বেশি। বিশেষ করে, আগের বছরের তুলনায় গত বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের খাদ্যসূচকের বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে— ৬ দশমিক ৯৫, ৭ দশমিক ৩২ ও ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যেখানে খাদ্যবহির্ভূত সূচকের বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫৩, ৩ দশমিক ৭৫ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে চালের দাম বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বলা যেতে পারে। চিত্র-২ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইরি/বোরো চালের কেজিপ্রতি পাইকারি মূল্য, ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে (দু-এক মাস ব্যতিক্রম বাদে) সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে বেড়ে চলেছে এবং শুধু মোটাচালই নয়, সব ধরনের (উচ্চ, মধ্যম, সাধারণ মানের) চালের দামের ক্ষেত্রেও এ ঊর্ধ্বগামিতা দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংকের দেয়া তথ্যানুযায়ী, জুনে মোটা চালের (coarse rice) দাম পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া উন্নত মানের চালের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। যেহেতু ভোক্তা মূল্যসূচকের ২০-২৫ শতাংশই হচ্ছে চাল, চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্যের হার শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। অক্টোবর থেকে অবশ্য খোলা বাজারে চালের দাম কিছুটা কমে এসেছে।
২০১৭-এর শেষ কয়েক মাসে অবশ্য শুধু চালই নয়, অন্য বেশকিছু খাদ্য উপাদানের দামের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এর কারণ হিসেবে মূলত গত আগস্টের বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতিকে মনে করা যেতে পারে। আগস্টের বন্যা ছাড়াও গত এপ্রিল-মে মাসে হাওড়াঞ্চলের বন্যার কারণে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বন্যার আগে থেকেই চড়া ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ার কারণে এবং বিশেষত বোরো ধানের বাম্পার ফলন হওয়ার কারণে জোগানের এ স্বল্পতা সামাল দেয়ার তেমন কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০১৭-এর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২ জেলার ২০৮টি উপজেলা এবং ১ লাখ ৪ হাজার ৯৪৯ হেক্টর জমি সম্পূর্ণভাবে ও ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬০ হেক্টর কৃষিজমি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৮৯০ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৪ হাজার ৭৬৪ কিলোমিটার রাস্তা আংশিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) খাদ্য উৎপাদন কমেছে ৯ লাখ ৪৩ হাজার টন, যার মধ্যে বোরো ধানের উৎপাদন কমেছে শূন্য দশমিক ৯৩ মিলিয়ন টন। আমনের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা শূন্য দশমিক ১৭ মিলিয়ন টন, যদিও আউশ ধানের উৎপাদন সামান্য বেড়েছে (শূন্য দশমিক ১৬ মিলিয়ন টন)। ধান ছাড়াও বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গমের (কমেছে ৩৬ হাজার টন উৎপাদন) মতো অন্যান্য খাদ্যশস্য ও শাকসবজি। বন্যা, অপর্যাপ্ত মজুদ, উচ্চ আমদানি শুল্ক ইত্যাদির কারণে নিকট ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা (inflationary expectation) তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই আড়তদার, মিলমালিক ও কৃষকরা এ সম্ভাবনার ভিত্তিতে পরে বেশি দামে চাল বিক্রির জন্য অধিক পরিমাণে চাল মজুদ করে রাখে, যা জোগানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে দাম আরো বাড়িয়ে দেয়।
চাহিদার তুলনায় জোগানের স্বল্পতা ও পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে বিপণন খরচ বেড়ে যাওয়াকে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির মূল কারণ ভাবা হলেও চালের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ককেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ সাল থেকে মূলত ভারত থেকে আসা অপেক্ষাকৃত সস্তা চালের আমদানি কমানোর মাধ্যমে দেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষার জন্য ২৬-২৮ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়। চালের সাম্প্রতিক উচ্চমূল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে এ উচ্চ আমদানি শুল্ককেও বলা যেতে পারে। কারণ চার-পাঁচ বছরের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিখাতে চাল আমদানি ছিল সবচেয়ে কম। এ পরিস্থিতিতে সরকার জুনে (১০ শতাংশ) ও পরবর্তীতে আগস্টে (২ শতাংশ) আমদানি শুল্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এর সঙ্গে চাল আমদানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ শুল্কও (regulatory duty) সম্পূর্ণভাবে রেয়াত করা হয়। এর সঙ্গে সরকারিভাবেও জোগানস্বল্পতা সামাল দিয়ে চালের দাম স্থিতিশীল করার জন্য ১৫ লাখ টন চাল ও পাঁচ লাখ টন গম আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত মজুদ ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ সব কিছুর প্রভাবে বর্তমানে খোলা বাজারে চালের দাম কিছুটা কমের দিকে হলেও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, খোলা বাজারে সাধারণ মানের ইরি/বোরো চালের দাম এখনো কেজিপ্রতি ৪৮ দশমিক ৫২ টাকা।
গত কয়েক মাসের মূল্যবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা থেকে সার্বিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। প্রথমত. মনে রাখতে হবে যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য নেয়া যেকোনো নীতি/পদক্ষেপ কার্যকর হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। সে কারণে দ্রব্যমূল্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের ক্ষেত্রে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, যাতে হঠাৎ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো প্রকার সংকট দেখা দিলে তা মোকাবেলা করার মতো ব্যবস্থা থাকে। তড়িঘড়ি করে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলে তার ফলাফল পেতে অনেক সময় চলে যেতে পারে। চালের মূল্যের মতো বিষয় যা স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে একটি সংবেদনশীল বিষয়, সেসব ক্ষেত্রে এ সময়ের ব্যবধান বিশেষভাবে জরুরি। এছাড়া অনেক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী এসব পদক্ষেপের ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করতে পারে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থার জন্য হানিকর হতে পারে।
দ্বিতীয়ত. দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্যের প্রবাহ এবং দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা, যাতে করে মধ্যস্বত্বভোগীরা চাহিদা-জোগানের সাময়িক ভারসাম্যহীনতার সুযোগ না নিতে পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পণ্যবাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের এপ্রিলে প্রতিযোগিতা কমিশন (Competition Commission) গঠন করা হলেও এখনো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এ প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না এবং এর পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াও প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের অভাবকে দায়ী করছেন গবেষকরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যপরিধি ও দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যবসায় ন্যায্যতা আনয়নের বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক, তাই সরকার/সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে সুষম প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত. মনে রাখতে হবে যে, মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের জোগানের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই সরকারের মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সঠিক সমন্বয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বিভিন্ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনার সম্পর্ক সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি।
চতুর্থত. হঠাৎ করে খাদ্যশস্যের ঘাটতি হলে তা মেটানোর জন্য তুলনামূলকভাবে কম মূল্যে আমদানির জন্য নতুন নতুন আমদানি বাজারের সঙ্গে আগে থেকেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।
পরিশেষে বলা চলে যে, সঠিক গবেষণার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য উৎপাদনের সঠিক তথ্য সংগ্রহে রাখতে হবে ও সে অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতেই শুধু নয়, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রেক্ষাপটে ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রাখার গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে, দ্রুততার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Developed by: