সর্বশেষ সংবাদ
সুরমা পয়েন্টে যুবলীগ নামধারী দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যুবক আহত  » «   সিলেটে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দিলেন পুলিশের আইজিপি  » «   চুনারুঘাটে দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১  » «   মিয়ানমারে আবারও সেনা অভ্যুত্থানের শঙ্কা  » «   সিলেট বিভাগে সেরা র‍্যাংকিংয়ে এমসি কলেজ  » «   ফেনীতে মুসলমান শিক্ষককে খুন করলেন বৌদ্ধ সহকর্মী শিক্ষক !  » «   বায়োলজিক্যাল ঘড়ি কী, যে কারণে নোবেল পুরস্কার  » «   নগরীতে বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্যসহ ২ শীর্ষ ব্যবসায়ী আটক  » «   চিকিৎসায় নোবেল পেলেন মার্কিন তিন বিজ্ঞানী  » «   সিলেটে বিদ্যুতের ডিজিটালাইজেশনের ফাঁদে দুই লাখ গ্রাহক!  » «   ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজারে বাড়ছে ঝুঁকি  » «   মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পায়নি কিশোর  » «   সিলেটে ৫৭৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, থাকছে তিনস্তরের নিরাপত্তা  » «   জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ জনের নাম প্রকাশ  » «   মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সু চি-সেনাপ্রধান  » «  

ক্ষেত খায় বেড়ায়



foxবিশেষপ্রতিবেদন :সুষ্ঠু তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে সিলেটে ওয়াক্‌ফ এস্টেটগুলোর হাজার হাজার একর জায়গা বেহাত হয়ে আছে। সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেড়ায় ক্ষেত খায়। যাদের ওপর দেখভালের দায়িত্ব সেই এস্টেটের মোতোয়ালি, ওয়াক্‌ফ প্রশাসনের পরিদর্শক এবং প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী প্রতারকরা পারস্পরিক যোগসাজশে বিভিন্ন ফাঁকফোকর বের করে জমি বিক্রি করে, ইজারা দিয়ে, রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজেরা সুফল ভোগ করছে। মামলা লেগে আছে কোথাও সরকারের সঙ্গে এস্টেটের, কোথাও এস্টেটের সঙ্গে দখলদারের, কোথাও মোতোয়ালি নিয়োগ নিয়ে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় মোট ৮৯০টি নিবন্ধিত ওয়াক্‌ফ এস্টেট। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে ৪৯০টি এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে ৪০০টি। সমগ্র ভূ-সম্পত্তির আয়তন একত্রে প্রায় ২৬ হাজার একর। এর মধ্যে ৭ হাজার ১৬২ একর জমি বেহাত, তথা প্রশাসনের আয়ত্তে নেই।
সিলেটের সবচেয়ে বড় এস্টেট কেবি এহিয়া তথা খানবাহাদুর এহিয়ার নামে। ১৯২২ সালে খান বাহাদুর এহিয়া (জিতু মিয়া) তার ২৪ হাজার একর সম্পত্তি আসাম সরকারকে ওয়াক্‌ফ করে যান। পরে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের সময় ১৯ হাজার একর জমি প্রজা-বিলি পদ্ধতিতে ভাগ করে দেওয়া হয়। এখন এস্টেটের জমি আছে সাড়ে ৫ হাজার একর। এর মোতোয়ালির দায়িত্বে রয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার। হবিগঞ্জের বানিয়াচংসহ বিভিন্ন স্থানে এই এস্টেটের কয়েকটি জলমহাল বেদখল হয়ে গেছে। স্বত্ব মামলা চলছে সরকারের সঙ্গে।
জানতে চাইলে কেবি এহিয়া ওয়াক্‌ফ এস্টেটের ম্যানেজার আবদুর রহমান বলেন, ‘এস্টেটের সম্পত্তি বেদখল হয়নি। শুধু সরকারের সঙ্গে মামলা চলছে।’
আরেকটি প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান সৈয়দিয়া ওয়াক্‌ফ এস্টেটের মোতোয়ালি এবং বংশের সুবিধাভোগীদের দীর্ঘ দিনের বিরোধের কারণে শত শত একর জায়গা যে যার মতো বিক্রি ও ইজারা দিয়েছেন। আসলে এই হাজার হাজার একর সম্পত্তির কতটুকু আছে, তা সঠিকভাবে জানাই দুস্কর। বলা হয়, বিমানবন্দর এলাকার ছালিয়া বড়শালা মৌজার ৭০ ভাগ জায়গা ওই এস্টেটের।
গত ২০ বছরে অধিকাংশ জায়গাই বেহাত। বর্তমান মোতোয়ালি হামিদ বখত মজুমদার এ বিষয়ে কথাই বলতে চাননি। তবে সুবিধাভোগী (অংশীদার) আকরার বখত মজুমদার বিপুল সম্পত্তি বেহাত ও বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, সব বিরোধ মিটিয়ে সম্পদ একটি ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, সুনামগঞ্জের আজম খান এস্টেটের বিশ্বম্ভরপুরের বিভিন্ন জলমহাল ও বাজার অস্বচ্ছভাবে ইজারা দিয়ে ভোগদখল করে আসছিলেন মোতোয়ালি শাহ সাজ্জাদুর রহমান। গত ১০-১২ বছরে এই উৎস থেকেই তিনি বিত্তশালী হয়েছেন। জায়গার নথি ও তালিকায় গরমিল থাকায় সম্প্রতি সরকার বাদী হয়ে মামলা করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। গত বছর থেকে সরকার ওই বাজার ও জলমহালগুলো প্রকাশ্যে ইজারা দেওয়া শুরু করেছে।
এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দা, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান তালুকদারও মোতোয়ালির অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে বিভাগীয় কমিশনারের রাজস্ব শাখায় মামলা করেন।
মোতোয়ালি সাজ্জাদুর রহমান অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, এস্টেটের জায়গা হিসেবেই তিনি ইজারা দিয়েছিলেন। তিনিও নিজের পক্ষে আইনি উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে জানান।
সিলেটের হায়দার ওয়াক্‌ফ এস্টেটের দু’জন মোতোয়ালি এনাম হোসেন রুমি ও কয়েছ মিয়া। চলছে বিরোধ। রুমির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ওয়াক্‌ফ এস্টেটের উত্তরাধিকারীদের অংশ না দিয়ে একাই সম্পদের আয় ভোগ করছেন। কয়েক বছর আগে নাইরপুল এলাকায় এস্টেটের ১৫ শতক জায়গা বিক্রি করে দেন। ৪ শতক নিজের নামে ও ৫ শতক তার মায়ের নামেও দলিল করেন।
গোয়াইনঘাট উপজেলায় এ এস্টেটের ৬৪ একরের দেওছড়া ও বাওছড়া নামে দুটি জলমহাল রয়েছে। গত বছর দুই মোতোয়ালি পৃথক দুই ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়ায় মুখোমুখি অবস্থান নেয় ইজারাদাররা। জায়গা থেকে ৩২৪টি গাছ কেটে ফেলে এক পক্ষ। অভিযোগ করা হয় সিলেট ওয়াক্‌ফ পরিদর্শকের কার্যালয়ে। সরেজমিন পরিদর্শন করে সত্যতাও পান পরিদর্শক। কিন্তু প্রতিবেদন দেন জড়িতদের বাদ দিয়ে। এস্টেটের সুবিধাভোগী আজমল হোসেন জগলু আদালতে মামলা করেন। তিনি বলেন, এস্টেট থেকে তিনি আয়ের কোনো অংশ পান না। তিনি ওয়াক্‌ফ পরিদর্শক ও মোতোয়ালির যোগসাজশের অভিযোগ করেন।
নগরীর আম্বরখানা মৌজার ৩৩৬ নং খতিয়ানের ৫৩৩ নং দাগে ২৪ শতক জায়গার মালিক ছিলেন নকুল উড়িয়ার ছেলে অরুণ উড়িয়া ও বরুণ উড়িয়া। অথচ ওই দাগের জায়গা খতিয়ানে দেখা গেছে গজনফর বখত ওয়াক্‌ফ এস্টেটের। এ নিয়ে সেটেলমেন্টে আপত্তি মামলা (নং ৯০৩০/২০১৬) চলছে।
ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় নেওয়ার অপচেষ্টার ফলে সিলেটের সলিমউল্লাহ, কুদরতউল্লাহ, আবদুল আজিজ ও হবিগঞ্জের নছরত রাজা, সুনামগঞ্জের শ্রীপুর এস্টেটসহ ৪ শতাধিক এস্টেটের অধিকাংশ জায়গা বর্তমানে বেহাত বলে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়।
সূত্রমতে, সিলেট জেলায় ওয়াক্‌ফ এস্টেট ২৭০টি, আর নগরে ১৭০টির মতো। সুবিখ্যাত হযরত শাহজালাল (রহ.) ওয়াক্‌ফ এস্টেট থেকে এখন সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না মামলার কারণে।
সিলেটের অধিকাংশ ওয়াক্‌ফ এস্টেটে নানা অনিয়মের পেছনে পরিদর্শকদেরও ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সিলেট ও সুনামগঞ্জের পরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন এবং হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পরিদর্শকের দায়িত্বে আছেন জাহাঙ্গীর আলম। মোতোয়ালি নিয়োগে স্বার্থসংশ্নিষ্ট সুপারিশ, কমিটি গঠন ও জায়গা বিক্রির অনুমতিতে তাদের সহায়তা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

একটি সাধারণ অভিযোগ, বছরে প্রতিটি এস্টেট থেকে লাখ লাখ টাকা আয় হলেও সরকারকে রাজস্ব দেওয়া হয় নামমাত্র। এ ক্ষেত্রে অংশীদাররাও বঞ্চিত হন এবং যোগসাজশে লাভবান হন মোতোয়ালি ও সরকারি পরিদর্শকরা।
অভিযোগ প্রসঙ্গে পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মোতোয়ালিরাই এস্টেট পরিচালনা করেন। আমরা সহায়তা করি মাত্র। তারা বছরে একটা রাজস্ব দেন। অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।’
জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘নথি ও তালিকা নেই বেশ কিছু এস্টেটের। এ নিয়ে সমস্যা হলেও কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।’
সহকারী ওয়াক্‌ফ প্রশাসক আবদুল কুদ্দুছ বলেন, ‘এক সময় মোতোয়ালিরা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এস্টেটের জায়গা বিক্রি করতেন। গত পাঁচ বছর ধরে তা হচ্ছে না। এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে।’
মোতোয়ালিদের বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উত্তরাধিকারদের মধ্যে বিরোধ থাকায় এ সমস্যা হয়। কিন্তু উত্তরাধিকাররা যাকে মোতোয়ালি করতে চাইবেন, তাকেই ওয়াক্‌ফ বিভাগ মোতোয়ালি নিয়োগ দেবে।

Developed by: