সর্বশেষ সংবাদ
সালমান শাহের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে সময় পেল পিবিআই  » «   এসডিসি কার্য্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত  » «   মৌলভীবাজারের ৫ জনের যুদ্ধাপরাধের রায় যে কোনো দিন  » «   এরা এখনো বিশ্বাস করে না পৃথিবী গোল!  » «   সাগরে লঘুচাপ, হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস  » «   লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা হয়েছে বিরল প্রজাতির লেজের ‘মোল’  » «   লন্ড‌নে এসিড হামলায় দু‌টি চোখ হারা‌লেন বাংলা‌দেশী তরুন  » «   জাফলংয়ে মাটি চাপায় কিশোরী নিহত, আহত ৪  » «   ক্লিনিক আর ডায়গনাস্টিক সেন্টারে সড়কজুড়ে যানজট  » «   কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হক আর নেই  » «   গোলাপগঞ্জে তেলবাহী লেগুনায় আগুন  » «   পিলখানা হত্যাকাণ্ড : হাইকোর্টের রায় ২৬ নভেম্বর  » «   লোদীর বাসায় মেয়র আরিফ: বিরোধের অবসান!  » «   নগরীতেে কোনদিন কোথায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ  » «   সৌদির বিরুদ্ধে লেবাননের যুদ্ধ ঘোষণা!  » «  

“আমরা যুদ্ধ চাই না শান্তি চাই, যুদ্ধ ছাড়া শান্তি নাই” অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ভূমিকা



Bd-pratidin-19-08-17-F-09মুকুল মাহমুদ:: আজ থেকে একশত বছর পূর্বে রুশ বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর অস্থায়ী কেরেনেস্কী সরকারকে পরাজিত করে বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার থেকে রাশিয়া এক মাস পিছিয়ে ছিল। রুশ ক্যালেন্ডার অনুসারে এই বিপ্লব অক্টোবর মাসের ২৫ তারিখ সংঘটিত হয়। সে হিসেবে ইতিহাসে তাই উহা অক্টোবর বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। অক্টোবর বিপ্লব কেবল মাত্র রুশ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে নয়। ১৯০৪ সালে আমষ্ট্রারডামে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ৬ষ্ঠ কংগ্রেসে গৃহীত বিশ্বযুদ্ধকে জাতিয়তযুদ্ধে পরিনত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন। অক্টোবর বিপ্লবের সাফল্য বিশ্ব

 কমিউনিস্ট আন্দোলনের শিক্ষা। সারা বিশ্বে অক্টোবর বিপ্লবের ঢেউ পড়েছিল। তৎকালীন রাশিয়ার সমাজ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বিপ্লবী পরিস্থিতিই অক্টোবর বিপ্লবের সূচনা করেছে। আজ একশত বৎসর পরেও দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে অক্টোবর বিপ্লবের দিন গুলির কথা স্মরন করিয়ে দেয়।

বিপ্লব পূর্ব রাশিয়া ছিল জার (সম্রাট) শাসিত চরম স্বৈঢ়তান্ত্রিক পররাজ্য গ্রাসী রাষ্ট্র। এশিয়ার কয়েকটি জাতি ছিল রাশিয়ার পদানত। রাশিয়ায় ছিল ভূমিদাস প্রথা। ভূমিদাসদের কিছু জমি দেওয়া হত সেখানে চাষাবাদ করে কোন রকমে বেঁচে থাকার জন্য। তার বদলে তাদেরকে জমিদারদের জমিতে ও অন্যান্য কজেও বেগার খাটতে হত। তারা ছিল জমিদারের দাস স্বরূপ। এক সময় জমিদার তাদের বেত্রাঘাত করতো এমনকি প্রানদন্ড পর্যন্ত দিতে পারতো। কৃষকরা ছিল অত্যান্ত দরিদ্র এবং অত্যাচারীত। রশিয়ায় দূর্ভিক্ষ লেগেই থাকতো। সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে কৃষকেরা ছিল নিপিড়ীত। এই ব্যবস্থা কৃষকের পায়ে শেকল পরাবার মত। সে জন্য কৃষকেরা জমি ছেড়ে বা কোন মতে সাধ্য-সাধনা করে গ্রাম ছেড়ে পালাতো। এমনি ভাবে জর্জিয়ার এক ভুমিদাস পরিবার অত্যাচারের কারনে তাদের ভাঙ্গা কুড়েঘর ফেলে পালিয়ে স্থান নিয়েছিল গোরী শহরে। পরিবারটি প্রথমে মুচির কাজ নেয়, পরে জুতো ফ্যাক্টরী হলে সেখানে মজুর হয়েছিল। সেই মজুরের ঘরে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের এক মহানায়ক জোসেফ স্টালিন। অক্টোবর বিপ্লব তার জীবনের পরর্বতী সাফল্যের সূচনা করেছিল।

রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে। রাশিয়ায় পূঁজিবাদের সূচনা পশ্চিম ইউরোপের অনেক পরে। তবে দ্রুত পুঁজিবাদী শিল্প করাখানা বিকাশ লাভ করতে থাকে। গ্রাম ছেড়ে আসা নিঃস্ব মানুষেরা কারখানার মজুরে পরিনত হয়। এ সব শ্রমিকের অধিকার বলে কিছু ছিলনা। শ্রমিকদের মজুরী ছিল খুবই সামান্য। দৈনিক ১৪-১৫ ঘন্টা কাজ করতে হত। মানবেতর জীবন যাপন করতে হতো। এই ছিল সে দিনকার রাশিয়া।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পরাজয়ের ফলে জার দূর্বল হয়ে ১৮৬১ সালে ভূমিদাস প্রথা বিলোপ ঘোষনা করে। এই বিদ্রোহে ভুমির মালিকানায় কিছু সংস্কার করেন। কিন্তু গরীব কৃষকেরা ইহাতেও ভূমির মালিকানা লাভ করতে পারেনি। বাস্তবে ভূমিদাস প্রথার রেশ রয়ে যায়। জমিদারদের হাত থেকে রক্ষার জন্য একটি নিস্কৃতি মূল্য দিতে হত, যার মূল্য সেই জমির তৎকালীণ বাজার মূল্য থেকেও বেশী ছিল। তার উপরে বেগার খাটার প্রথা একবারে উঠে যায় নি। অত্যাচারের কারনে জারতন্ত্র বিরোধী সন্ত্রাসবাদী দল গড়ে ওঠে রাশিয়ায়।
উনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়ার জারের বিরদ্ধে যারা সংগ্রাম পরিচালনা করতেন তাদেরকে নারদনিক বলা হত। রুশ ভাষায় নারদ মানে জনগন। নারদনিক জনগন পন্থী। নারদনিকরা প্রথমে কৃষকদের উদ্ভূদ্ধ করতে চেষ্টা করেন জার তন্ত্রের বিরুদ্ধে। এই জন্যে তাদের মধ্যে থেকে একদল বুদ্ধিজীবি গ্রামে চলে যান। তারা কৃষকদের মতই পোশাক পরতেন কিন্তু কৃষকদের সস্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান ছিল না। তারা কৃষকদের সমর্থন লাভ করতে পারেনি। তারা সমাজতন্ত্র মানতেন কিন্তু শ্রমিক শ্রেনীর আদর্শে বিশ্বাসী নয় । তারা মনে করে কিছু সংখ্যক বীরেরাই ইতিহাস সৃষ্টি করে। এক পর্যায় নারদনিকরা ব্যক্তি সন্ত্রাস বাদের পথ গ্রহন করে। “নারদ ভনিয়া” যার অর্থ জনগনের ইচ্ছা নামক একটি সংগঠন ১৮৮১ সালের পহেলা মার্চ জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার সেন্ট নিকোলাসকে বোমা মেরে হত্যা করে। ফলে তাদের উপর পুলিশের অত্যাচার নেমে আসে। অধিকাংশই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। বিচারে নারদ নেতার ফাঁসিতে মৃত্যদন্ড হয়। ধীরে ধীরে নারদপন্থীদের মধ্যে পরিবর্তন আসে। তারা বিপ্লবী কার্যক্রম পরিত্যাগ করে জার সরকারের সঙ্গে আপসের চেষ্টা চালান। বিপ্লবী থেকে উদার পন্থীতে পরিনত হন। অন্যদিকে নারদনিকদের আর একটি গ্রুপ ব্যক্তি সন্ত্রাস বাদের কৌশলে থেকে যায়। এরা জারের আহবানে দুমা নির্বাচনে অংশ গ্রহন করে। রাশিয়ায় নির্বাচিত জাতীয় প্রতিনিধিত্ব মূলক প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ পার্লামেন্টকে দুমা বলা হয়। ১৯০৫ সালে জারের রাশিয়ায় প্রথম দুমা নির্বাচিত হয়। দুমা নির্বাচনে বলশেভিকরা অংশ নিতেন কিন্তু সরকারে অংশ নিতেন না। মেনশেভিক ও স্যোসাল রেভ্যুলশনারী-রা সরকারে অংশনিত। জার তন্ত্র পতনের পর মেনশেভিকদের সাথে অস্থায়ী কেরেনেস্কী সরকার গঠন করে।

নারদ ছিল লেনিনের বড় ভাই। নারদের যখন ফাঁসি হয় তখন লেনিনের বয়স ছিল ১৭ বছর । তিনি তখন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৮৮৭ সালে লেনিন কাজানবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। লেনিন প্রথম জীবনে নারদপন্থীদের অনুরাগী ছিলেন। বিশ্ব বিদ্যালয়ে নারদ পন্থী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারনে বহিস্কৃত ও গ্রেফতার হন। মুক্ত হয়ে তিনি সামারা শহরে চলে যান । সেখানে ১৮৯১ সালে প্লেখানভের লেখার সঙ্গে পরিচিত হন। প্লেখানভের ছিল বিশাল পান্ডিত্য। ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার স্বাচ্ছন্দ পদচারনা ছিল। রাশিয়ায় মার্কসবাদ নিয়ে আসার প্রথম কৃতিত্ব প্লেখানভের। প্লেখানভও প্রথম জীবনে নারদনিক ছিলেন। জার সরকাররের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য তিনি সেচ্ছা নির্বাসনে গিয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডে। তখন রাশিয়া থেকে অনেকেই এভাবে পালিয়ে এসে বিদেশে বাস করতেন। এখানে এসে তিনি মার্কসাবাদের সাথে পরিচিত হন। ১৮৮৩ সালে জেনেভা শহরে কয়েকজন শুভাকাংঙ্খি নিয়ে গড়ে তোলেন রুশ মার্কসবাদী গ্রুপ যা পরে” শ্রমিক মুক্তি সংঘ ” নামে পরিচিত। এই গ্রুপটি এঙ্গেলসের বেশ কিছু রচনা যথা- কমিউনিষ্ট ইশতেহার শ্রম ও পুঁজি, সমাজতন্ত্র ইউটোপিয়া ও বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি গ্রন্থ রুশ ভাষায় অনুবাদ করে প্রচার করেন। প্লেখানভের নেতৃত্বে শ্রমিক মুক্তি সংঘ গ্রুপ রাশিয়ায় একটি মার্কবাদী পার্টি গড়ে তোলার জন্য ১৮৮৪ ও ১৮৮৭ সনে দুইটি খসড়া কর্মসূচী প্রনয়ন করে। তার আরেকটি কৃতিত্ব নারদনিকদের ভ্রান্ত মতবাদের বিরদ্ধে তিনিই প্রথম মতাদর্শগত সংগ্রাম শুরু করেন।

সামারা শহরে লেনিনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল একটি মার্কবাদী পাঠচক্র। ১৮৯৩ সনে তিনি পিটাসবার্গে চলে আসেন। ১৮৯৫ সালে সেই পিটার্সবার্গে বিশটির মত মার্কবাদী শ্রমিক চক্র একত্র করে, শ্রমিক শ্রেনীর একটি একক দল “শ্রমিক শ্রেনীর মুক্তি সংগ্রামলীগ” গঠন করেন। লেনিনই প্রথম শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের ঐক্য সাধনের সূচনা করেছিনেল। লীগের নেতৃত্বে পিটাসবার্গে ত্রিশ হাজার শ্রমিকের এক বিরাট ধর্মঘট হয়েছিল,শ্রমিকদের কাজের ঘন্টা দৈনিক সাড়ে এগার ঘন্টা বেধে দিয়ে আইন জারী করার দাবিতে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জার সরকার লেনিনকে গ্রেফতার করে। ১৮৯৭ সালে তাকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠায়।

রাশিয়ার মার্কসবাদীরা বিভিন্ন নামে মার্কসবাদী সংগঠন গুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মার্কসবাদী দল গঠনের তাগিদ অনুভব করলেন। ১৮৯৮ সালে মাত্র নয়জন প্রতিনিধি নিয়ে মিনস্ক শহরে এক কংগ্রেসের মাধ্যমে “রুশ স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি” গঠন করে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সিদ্ধান্ত অনুসারে সারা বিশ্বের মার্কস্বাদী দল গুলোর তখন নাম ছিল “সোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি”। অক্টোবর বিপ্লবের পর পার্টির নাম রাখা হয় “কমিউনিস্ট পার্টি”। এখন স্যোসাল ডেমোক্রেট বলতে বূর্জোয়া সংস্কার বাদীদের বুঝায়। ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে লেনিন নির্বাসন থেকে মুক্তিপান। সাইবেরিয়ার নির্বাসনে থাকার কারনে স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিষ্ঠার কংগ্রেসে লেনিন উপস্থিত থাকতে পারেন নি। এই কংগ্রেস পার্টির ঘোষনা পত্র ছাড়া আর তেমন কোনো কিছুই প্রকাশ করা হয়নি।

১৮৮৯ সালে মার্কসের মৃত্যুর পরে বিশ্বের সমস্ত মার্কস বাদীরা প্যারিসে মিলিত হয়ে গঠন করে দ্বিতীয় “আন্তর্জাতিক স্যোসালিস্ট ব্যূরো”। সাধারন ভাবে মার্কসীয় চিন্তা নিয়েই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের যাত্রা শুরু। প্রথম আর্ন্তজাতিকের শেষ পর্যায়ে মার্কস পন্থীদের সাথে বাকুনিনবাদ ও নৈরাজ্যবাদীদের সংগ্রাম হয়। নৈরাজ্যবাদীরা পরাজিত ও বিতাড়িত হয় কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন থেকে একেবারে সরে যায়নি। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতৃত্ব গ্রহন করে জার্মান “স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি”-র নেতা কাউটস্কী। ২৫ বছর অস্থিত্বের মধ্যে ইহার ৯ টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৪ সালে ভিয়েনায় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ২৫ বছর পূর্তিতে ৮ম কংগ্রেস অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও সমগ্র ইউরোপ ব্যাপী যুদ্ধের পরিস্থিতি ঘনিয়ে আসলে ইহার আগেই “আন্তর্জাতিক স্যোসালিস্ট ব্যূরো”-র কংগ্রেস ব্রাসেলসে ১৯১২ সালে ডাকা হয়।

যুদ্ধের বিষয়টি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সবকটি কংগ্রেসেই আলোচ্য বিষয় হিসেবে ছিল। প্রথম কংগ্রেসে যুদ্ধের বিপদের কথা বলা হয়। দ্বিতীয় কংগ্রেসে ঘোষনা করা হয় যুদ্ধের বিপদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেনীকে প্রবল প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে। তৃতীয় কংগ্রেসে আরেক ধাপ এগিয়ে বলা হয় শ্রমিক শ্রেনীকে সাধারন নিরস্ত্রীকরনের দাবী নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে এবং পার্লামেন্টে যুদ্ধ বাজেটের বিরুদ্ধে ভোট দিতে হবে। চতুর্থ কংগ্রেসে স্থায়ী সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দিয়ে জনগনকে সশস্ত্র করার দাবী তোলা হয়। পঞ্চম কংগেসে য্দ্ধু ও উপনিবেশ বাদ সম্পর্কে বিপ্লবী দৃষ্টি ভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছিল। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রী রোজা লুক্সেমবার্গ বলেন, শ্রমিক শ্রেনীকে ঔপনিবেশিক কর্ম-নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় ভাবে সংগ্রাম করতে হবে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুবকদের সংগঠিত করা, পার্লামেন্টে সামরিক ব্যয়ের বিরুদ্ধে ভোট দেয়া এবং আন্তর্জাতিক সংকট দেখা দিলে সকল দেশে যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে হবে।

৬ষ্ঠ কংগেস আমস্ট্রারডাম-এ অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৪ সালে । রুশ জাপান তখন যুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক যোগে সংগ্রাম চালানোর দৃপ্ত ঘোষনা দেন রুশ প্রতিনিধি প্লেখানভ এবং জাপানি প্রতিনিধি কাতয়ামা। এই কংগ্রেসে প্রথম বারের মত একটি কেন্দ্রিয় দপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় ব্রাসেলসে। এই কেন্দ্রের নাম হয় “আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বূরো”। প্রথম আন্তর্জাতিকের মত ইহা কখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। ইহা ছিল অনেকটা পোস্ট বক্সের মত যোগাযোগের মাধ্যম।

সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০৭ সালে জার্মানীর স্টুটগার্ডে । এই কংগ্রেসে ৫০ হাজার শ্রমিক নিয়ে উদ্ভোধন করা হয়। এই কংগ্রেসে ডাচ প্রতিনিধি ভালকন উপনিবেশ সম্পর্কিত এ যাবৎ কালের লাইনের পাল্টা প্রস্তাব আনলেন। তাকে সমর্থন করেছিল বার্নস্তাইন। প্রস্তাবে “সমাজতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক কর্মনীতি” বলে এক নয়ানীতি আমদানী করা হল। ইহাতে কলোনীর স্বাধীনতার কথা নেই, বরং ঔপনিবেশিকবাদ-কে ঐতিহাসিক অনিবার্য বলে মেনে নেওয়া হল। প্রস্থাবে আরও বলা হল “উপনিবেশের জনগনের অবস্থার উন্নতির জন্য, সারা দুনিয়ার ভালোর জন্য, উপনিবেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বিকাশের জন্য ও সভ্যতা বিকাশে সাম্রারাজ্যবাদের ভূমিকা আছে”। ইহার মর্মার্থ হলসাম্রারাজ্যবাদের কলোনী থাকবে এবং লুন্ঠন করারও অধিকার থাকবে। উপনিবেশ বাদের ঘৃনিত এই প্রস্তাবটি পরাজিত হলেও কিন্তু কম ভোট পায়নি। ১২৭ ও ১০৮ ভোটে পারাজিত হয়েছিল। তখনই ইউরোপে যুদ্ধের আশংকা দেখা দিয়েছিল। ইউরোপের পুঁজিবাদী সাম্রারাজ্যবাদী রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে দুনিয়া ব্যাপী লুন্ঠনের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সামরিক সংঘর্ষ হতে যাচ্ছে এমন একটি ধারনা আগে থেকেই স্পষ্ট হয়ে আসছিল। সাম্রারাজ্যবাদী সরকার গুলো কখনোই বলেনা যে তারা লুন্ঠনের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ঝগড়া করছে। প্রত্যেকটি দেশই অন্যকোনো অজুহাত উপস্থিত করে। আসল কারন হলো সাম্রারাজ্যবাদীদের অভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক সংকট যা রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে সামরিক সংঘর্ষে আত্মপ্রকাশ করে। এই যুদ্ধ সম্পর্কে বেবেল কর্তৃক রচিত প্রস্থাবটি সংশোধনী এনেছিল রোজা লুস্কেমবার্গ। তিনি যুদ্ধ বিষয়ক উপ-কমিটির আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন।

বেবেলের প্রস্তাবটি সঠিক ছিল কিন্তু যুদ্ধ বেধে গেলে করনীয় দিকটি অনুপস্থিত ছিল। লেনিন ও লুস্কেমবার্গ এই প্রস্তাবের খসড়ার সাথে কিছু সংযুক্তি দেন। শ্রমিক শ্রেনীকে পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিদের সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ অবসানের জন্য হস্তক্ষেপ করতে হবে। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্যাবহার করে বূর্জোয়া শাসনের পতন ঘটানোর জন্য জনগনকে রাজনৈতিক ভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পার্লামেন্টে যুদ্ধ ঋৃণের বিপক্ষে ভোট দিতে হবে। সাম্রারাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিনত করতে হবে। কেবল মাত্র যুদ্ধাবসানের জন্যই নয়, সাধারন ভাবে শ্রেনী শাসন উচ্ছেদকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে ব্যবহার করে প্রচারাভিযান চালাতে হবে।
লেনিন বলেন, “পুঁজিপতিরা নিজেদের মধ্যে কে কতটা মুনাফার ভাগ বসাবে আর সেই যুদ্ধে একদেশের শ্রমিক গুলি চালাবে আরেক দেশের শ্রমিকের বুকে? নিজ নিজ দেশের শোষক শ্রেনীর স্বার্থে জীবন দিতে হবে শ্রমিককে ? সৈন্যরা শ্রমজীবি মানুষের সন্তান, তাই তারা প্রভুদের এই ঝগড়ায় অংশীদার হতে পারে না। বড় বড়সাম্রারাজ্যবাদী রাষ্ট্র গুলো যুদ্ধ করছে অন্যদেশের পিতৃভূমি গ্রাস করতে। এই যুদ্ধ কে জনগনের দোহাই দিয়ে কোনো ক্রমেই সমর্থন করা যায় না। যদি শ্রমিকেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যায় তবে সেটা হবে অপরাধ”।

আনুষ্ঠানিক ভাবে একমত হলেও এই নীতির সাথে জার্মান সোসালিস্ট পার্টির নেতা কাউটস্কী দ্বি-মত পোষন করে। রুশ নেতা প্লেখানভও তার সাথে একমত পোষন করে। সেই থেকে প্লেখানভের রাজনৈতিক স্খলন শুরু হয়। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পতনের সূত্রপাত হয় ৭ম কংগ্রেসে ১৯০৭ সাল থেকে।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ৮ম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে কোপেন হেগে। এই কংগ্রেসে সাম্রারাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরের রননীতি গৃহিত হয়। এই কংগ্রেসে গৃহিত যুদ্ধ সংক্রান্ত ইশতেহার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে ব্রাসেলস্ ইশতেহার নামে পরিচিত। এই ইশতেহারে বলা হয় দেশে দেশে শাসক বূর্জোয়াদের স্বার্থের সংঘাতে শ্রমিক শ্রেনী ও তার সন্তানসন্তুতি সৈনিকরা জড়াতে পারে না। সেদিন ইউরোপে শ্রমজীবি মানুষের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ বিরুধী মনোভাব গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বাধা হয়ে দাড়ালো কাউটস্কী ও প্লেখানভ। মেনশেভিকরাও প্লেখানভের পক্ষ অবলম্বন করে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদী নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ মধ্য পন্থা গ্রহন করে। মধ্য পন্থীরা যুদ্ধ ঋনের বিপক্ষে ভোট দানে বিরত থাকে। কাউটস্কী, ট্রটস্কী ও মালটভ খোলাখুলী ভাবে সাম্রারাজ্যবাদী যুদ্ধের পক্ষ অবলম্বন করে। তারা পিতৃভূমি রক্ষার নামে নিজ নিজ দেশের সরকারের পক্ষ অবলম্বন করে। কেউ কেউ মন্ত্রী সভায়ও অংশ গ্রহন করে। জার্মান স্যোসাল ডেমোক্রেটরা ভোট দিলেন সমর ঋৃণের পক্ষে। একমাত্র বলশেভিক ও অন্যান্য দেশের ছোট ছোট কিছু বিপ্লবী অংশ বাদে সকল পার্টিই নিজ নিজ সরকারের পক্ষে দাড়ায়। বাসলে কংগ্রেসের ঘোষনা থেকে সড়ে দাড়াবার ফলে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পতন হয়। বলশেভিক পার্টি দুমা-য় যুদ্ধের বিরোধীতা করে। ফলে দুমা-য় যে সকল বলশেভিক প্রতিনিধি ছিল সকলেই গ্রেফতার হল।
যুদ্ধ সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রস্তাবটি গৃহীত হয় ১৯১২ সালে নবম কংগ্রেস ভিয়েনায়। অষ্ট্রিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে যে রিরোধ চলছিল তাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ আসন্ন হয়ে ওঠে। তাই এই কংগ্রেস নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসে কমনিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্যুরো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পতনের মুখোমুখি হয়ে যায়।

১৯০৩ সালের জুলাই মাসে ব্রাসেলস্ ও লন্ডনে “রুশ স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টির” দ্বিতীয় কংগ্রেস গোপনে অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ টি সংগঠনের ৪৩ জন প্রতিনিধি ছিল যাদের সর্বমোট ভোট ছিল ৫১ টি। এই কংগ্রেস পার্টির গঠনতন্ত্র নিয়ে মার্তপের সাথে লেনিনের বিতর্ক হয়। লেনিন বলেছিলেন, যে ব্যক্তি কর্মসূচী মনে প্রানে গ্রহন করবে, পার্টিকে আর্থিক সহায়তা করবে এবং পার্টির কোন শাখায় সক্রিয় থাকবে তিনিই সদস্য হতে পারবেন। পার্টির কোনো না কোনো শাখায় থাকার এই শৃংখলা মানাকে মার্তপ আবশ্যিক শর্ত হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়। তিনি চেয়েছিলেন একটি আলাগা ধরনের আন্দোলন মুখী পার্টি। যার সীমারেখা সুষ্পষ্ট নয়। অন্যদিকে লেনিন চেয়েছিলেন একটি সুশৃংখল পার্টি যা আকারে ছোট হলেও কার্যত শক্তিশালী। যা বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা রাখে। এই বিতর্কে লেনিনের পক্ষে ছিলেন প্লেখানভ এবং মার্তপের পক্ষে ছিলেন ট্রটস্কী ও অন্যান্যরা। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক থেকে পর্যবেক্ষক প্রতিনিধি রোজা লুক্সেমবার্গ লেনিনের এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেননি। তিনি ছিলেন পোল্যান্ডের নাগরিক কিন্তু জার্মান “স্যোসাল ডেমোক্রেটিক” পার্টির নেত্রী। ১৯১৮ সালে জার্মান রাজতন্ত্র উৎচ্ছেদ আন্দোলনে সংস্কার পন্থা অবলম্বনের কারনে তিনি ও লিবখট আততায়ীর হাতে নিহত হন।
বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য কংগ্রেস ভোটাভুটিতে দেয়া হয়। ভোটে লেনিনের পক্ষে ২২ ভোট এবং মার্তপের পক্ষে ২৮ ভোট পড়ে। একজন ভোটদানে বিরত থাকে। এই কংগ্রেসে ইহুদী জাতির জন্য স্বতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলে বুন্দে পন্থীরা কংগ্রেস ত্যাগ করে। বুন্দে পন্থীরা মার্তপের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ফলে মার্তপ পন্থীরা সংখ্যা লঘিষ্ঠ এবং লেনিন পন্থীরা সংখ্যাগরিষ্ট হয়ে যায়। রুশ ভাষায় বলশেভিক হল সংখ্যা গড়িষ্ঠ এবং মেনশেভিক হলো সংখ্যা লঘিষ্ঠ। সেই থেকে একেই পার্টির মধ্যে বলশেভিক ও মেনসেভিক স্বতন্ত্র দুটি ধারা বিরাজ করে আসছে।

১৯০৪ সালের জানুয়ারীতে জাপান রাশিয়ার পোর্ট আর্থার দখল করে নেয়। যুদ্ধে জাপানের কাছে রাশিয়া প্রচন্ড রকম মার খেল । রুশ সেনা বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়। পরাজিত হয়ে জাপানের সাথে অপমান জনক সন্ধি করলেন। এই যুদ্ধে ট্রটস্কী ও মেনশেভিকরা পিতৃভূমি রক্ষা করার কথা বলে জার সরকারকে সহায়তা করে। কিন্তু লেনিন বললেন যুদ্ধের পরাজয় জার তন্ত্রকে দূর্বল করবে, বিপ্লবকে জোরদার করবে। তার মতে পোর্ট আর্থারের পতন হল স্বৈঢ়তন্ত্রের পতনের সূচনা। রাশিয়ার পার্টির অভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ করে। জর্মান পার্টির নেতা কাউটস্কী মেনশেভিকদের প্রতি সমর্থন করে। লেনিন রাশিয়ার পার্টির উপর ভিন দেশী প্রভাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে দ্বিতীয় “আন্তর্জাতিক ব্যুরো” বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য বেবেলের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ইতিমধ্যে রাশিয়ায় যুদ্ধ বেধে যায়। বিপ্লবের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় বলশেভিক পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস। ১৯০৫ সালের এপ্রিল মাসে লন্ডনে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় গোপনে। বলশেভিকরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে কংগ্রেস করার জন্য মেনশেভিকদের আহবান করেন কিন্তু মেনশেভিকরা উহাতে কর্ণপাত করেনি। তারা প্রায় একেই সময় পৃথক সম্মেলনে মিলিত হয় জেনেভায়। তখন পার্টি এক থাকলেও কার্যত দু’টো স্বতন্ত্র কেন্দ্রে কাজ করতো। বলশেভিকদের কংগ্রেস এবং মেনশেভিকদের সম্মেলন থেকে চলমান বিপ্লব প্রসংঙ্গে সম্পূর্ন ভিন্ন দুই ধরনের রনকৌশল বেরিয়ে আসে।

১৯০৬ সালের এপ্রিলে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয় পার্টির চতুর্থ কংগ্রেস । কংগ্রেসে মেনশেভিকরাও অংশ গ্রহন করে। এই কংগ্রেস ঐক্য কংগ্রেস নামে পরিচিত। আনুষ্ঠানিক ঐক্য হলেও কার্যত বলশেভিক ও মেনশেভিক দু’টি অংশের মধ্যে পার্থক্য আরো তীব্র হয়ে যায় এবং দুই অংশের দুই নীতি ও কর্ম পদ্ধতি আগের মতই থাকে। চতুর্থ কংগ্রেসে মেন শেভিকদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল কারন এই কংগ্রেসে বুন্দে পন্থীরা আবার পার্টিতে প্রবেশ করে। নির্বাচিত কেদ্রিয় কমিটিতে ৬ জন মেনশেভিক ও তিন জন বলশেভিক স্থান পায়। পার্টির মুখপত্রের সম্পাদক মন্ডলীতে সব ক’জনই ছিলেন মেনশেভিক।

১৯০৭ সালের মে মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় পার্টির ৫ম কংগ্রেস। এখানে বলশেভিকদের সামান্য সংখ্যা গড়িষ্ঠাতা ছিল। এই কংগ্রেসে পার্টির উভয় অংশ মিলে মোট দেড় লক্ষ্যের মত ডেলিগেট ছিল। কংগ্রেসে ট্রটস্কী একটি মধ্য পন্থা গ্রুপ দাড় করে। ১৯১২ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিনত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলশেভিকরা, মেনশেভিকদের থেকে চূড়ান্ত পৃথক হয়ে দল গঠন করে।

অক্টোবর বিপ্লবের সাথে যোগ সূত্র ছিল তৎকালীন রুশ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্ব বিপ্লবী পরিস্থিতি। রাশিয়ায় বিপ্লব হয়েছিল তিনটি। ১৯০৫ সালের জানুয়ারী মাসে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বূর্জোয়া গনতান্ত্রিক বিপ্লব। এই বিপ্লবে সর্বাধিক অংশ গ্রহন ছিল “স্যোসাল রেভ্যুলেশনারী”-দের। “স্যোসাল রেভ্যুলেশনারী”-রা ছিল নারদ পন্থী। এই যুদ্ধে বলশেভিক পার্টি রাজতন্ত্র পতনের জন্য কৃষক ও সেনাবাহিনীর মধ্যে শসন্ত্র গেরিলা তৎপরতা চালায়। বিভিন্ন শহরে জনগনের স্বত:স্ফুত তৎপরতায় শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েত গঠিত হয়। ডিসেম্বর মাসে শ্রমিক প্রতিনিধিদের মস্কো সোভিয়েত সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেয়। আশা করা গিয়েছিল নগর রক্ষীবাহিনীর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা বিশ্বাস ঘাতকতা করলে বিপ্লব ব্যার্থ হয়।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই বিপ্লবের অনুকূলে প্রবাহ সৃষ্ঠি করতে লাগালো। বলশেভিকরা দুমায় অংশ গ্রহন, অবরোধ ধর্মঘটে ও অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৯১৪ সালের ১ আগষ্ট বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হল। ১৪ জুলাই জার্মান রাশিয়া আক্রমন করে। এর জন্য ফরাসি সামজতন্ত্রী পার্টি জার্মানীকে অভিযুক্ত করলো। জার্মান স্যোসাল ডেমোক্রেটরা পার্লামেন্টে সমর্থন দিল সমর ঋৃনের পক্ষে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রায় সবগুলো স্যোসাল ডেমোক্রেট পার্টি স্ব-স্ব দেশের সরকারকে সমর্থন দিল। মেনশেভিকরা দোষ দিল জার্মানকে। “স্যোসাল রেভুলেশনারী”-রাও তাই করলো। অন্যদিকে অষ্ট্রিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে যুদ্ধের জন্য জার্মান স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি রার্শিয়াকে দায়ী করলো।

১৯১৪ সালের জুন-জুলাই মাসের মধ্যে রাশিয়ায় সশন্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। বলশেভিকরা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিনত করার কথা বলে রাশিয়ায় বিপ্লবের জন্য যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল তাহাই অক্টোবর বিপ্লব।

মার্কসের আমলে পুঁজিবাদ ছিল অবাধ প্রতিযোগিতার যুগ । কিন্তু প্রতিযোগীতা থেকে যে পুঁজিবাদ একচেটিয়াত্বের দিকে যাচ্ছে সেই প্রবনতার কথা মার্কস যদিও উল্লেখ করেছেন লেনিনের আমলে একচেটিয়া পুঁজিবাদে রুপান্তর সর্ম্পন্ন হয়েছিল। এটা ঘটেছিল উনবিংশ শতকের শেষ এবং বিংশ শতকের শুরুতে। একচেটিয়া পুঁজিবাদই হল সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদ। বাজার দখল ও পুঁজি আধিপত্যের জায়গা নিয়ে সাম্রারজ্যবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়ে যায়। যার পরিনতিতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এটা হতোনা যদি পৃথিবীতে এমন কোনো নতুন জায়গা থাকতো যেখানে এ পর্যন্তও কোনো পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটেনি। পুঁজিবাদের একচেটিয়াত্ব প্রথম যে যুদ্ধের মুখোমুখী দাঢ় কড়িয়ে দিয়েছিল তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

সাম্রারাজ্যবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় জন্মনেয় ফিনান্স পুঁজির শোষন ব্যাবস্থা । শিল্প ও ব্যাংকের সংমিশ্রনের মধ্যে দিয়ে তৈরী হল ফিনান্স পুঁজি । যা গোটা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রন করে। অধিকতর মুনাফার স্বার্থে এই ফিনান্স চলে যায় অর্থনৈতিক ভাবে অনুন্নত দেশে। ফিনান্স পুঁজি ও তাকে ঘিরে যে ফিনান্সিয়াল প্রতিদন্দ্বিতা তৈরী হয় তাা -ই এ যুগের শাসক ও শোষক শ্রেনীর স্বার্থে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের নীতি তৈরী করে । ফিনান্স পুঁজির পাচার হচ্ছে আধুনিক পুঁজিবাদী সাম্রারাজ্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ঠ। একটি দেশের মধ্যে যেমন বিভিন্ন পুঁজিবাদের ট্রাস্ট কার্টেল ও সিন্ডিকেট তৈরী হয়। বিশ্ব ব্যাংকের একচেটিয়াত্বের সার্থে তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ও বিভিন্ন দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মধ্যে যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুঁজির সমাহার, একই সাথে বাজার দখল ও আধিপত্যের জায়গা নিয়ে তাদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। যার পরিনতিতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এটা হতনা যদি পুঁজির সাম্রাজ্য বিস্তারের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকতো।

১৯০৭ সালেই সাম্রারাজ্যবাদীদের দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বি জোট তৈরী হয়। এক দিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইটালী। তাদের সমর্থনে ছিল বুলগেরিয়া ও তুরস্ক। যুদ্ধ শুরু হলে ইতালী দল ত্যাগ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পক্ষ নেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্স ছিল পূরনো পুঁজিবাদী রাষ্ট্র । জার্মানীতে বিলম্বে পুঁজিবাদের বিকাশ হলেও তা দ্রুত শক্তিশালী সাম্রারাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিনত হয়। বৃটেন প্রথম থেকেই জার্মানীকে প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে দেখে আসছিল। কারন জার্মান পন্য বিশ্ব বাজার থেকে ব্রিটেনকে হটিয়ে দিয়েছিল। তাই ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল জার্মানকে বিশ্ব থেকে একেবারে চূর্ন করে দেওয়া । ব্রিটেনের আরও মতলব ছিল তুরস্কের কাছ থেকে মেসোপটেমিয়া ও প্যালেস্টাইন কেড়ে নেওয়া এবং মিশরে তাদের অবস্থানকে দৃঢ় করা। ফরাসি পুজিঁবাদের লক্ষ ছিল জার্মানীর কাছ থেকে কয়লা ও লৌহ সম্পদে সমৃদ্ধ আলকাস ও লোরেন প্রদেশ দু’টি পুন:রুদ্ধার করা। অন্যদিকে বাগদাদ রেল পথ তৈরী করে ব্রিটেনের প্রভুত্বের পথে বাধা সৃষ্টি করে জার্মানী । জার্মানীর উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দখল করা উপনিবেশ গুলোর কিছুটা ছিনিয়ে নেয়া এবং জার সাম্রারাজ্যের ইউক্রেন, পোল্যান্ড, ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশ গুলো দখল করা। রাশিয়া তাই এই যুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পক্ষে জড়িয়ে পড়ে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাম্রারাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে। রাশিয়াও সে সময় একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছিল। রাশিয়া কৃষি প্রধান দেশ হলেও গ্রামাঞ্চলে পুঁজিবাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। জারের রাশিয়ার অধীনে ছিল এশিয়ার বেশ কিছু জাতি। রাশিয়ায় ব্রিটিশ ও ফরাসি পুঁজি খাটতো, তা ছাড়া রাশিয়া তুরস্কের সাম্রারাজ্যকে ভাগ বাটোয়ারা করার পক্ষে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপর নির্ভরশীল জারের রাশিয়া ইঙ্গ-ফরাসি জোটের দিকে থাকা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না।

১৯১৪ সালে জার্মানীর সঙ্গে রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে । যুদ্ধে রাশিয়া ক্রমাগত মার খেতে থাকে। জার্মানরা পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোর খানিকটা দখল করে দেয়। জারের শ্বেত সৈন্যবাহিনীর যুদ্ধ মোকাবেলায় তেমন কোন প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা ছিল না। এ দিকে দেশের মধ্যেও অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। খাদ্যভাব ছিল চরমে। কাঁচমাল ও জ্বালানীর সংকট দেখা দিল । কারখানা গুলো বন্ধ হয়ে যেতে থাকে । গন অসোন্তষ বিদ্রোহে রূপ নেয়। যুদ্ধ ফ্রন্টের সৈনিকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দেয়। লোকজন রাস্তায় রুটির জন্য নামে, শ্রমিকরা সৈনিকদের অস্ত্র কেড়ে নিতে লাগলো। যুদ্ধের অসন্তোষ বূর্জোয়াদের মধ্যেও দেখা দেয়। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তির উদ্যোগ নিতে রাজি হল না। কারন যুদ্ধের সুযোগে বূর্জোয়াদের মূনাফা হচ্ছিল ভাল। তারা অপদার্থ জার দ্বিতীয় নিকোলাসকে সড়িয়ে তার ছোট ভাই মাইকেল রোমনভকে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্ঠা করেছিল। কিন্তু সৈনিকরা জারের মন্ত্রীদের গ্রেফতার করতে লাগলো। ২৬ ফেব্রুয়ারী ১৯১৭ জার দুমা ভেঙ্গে দেয় এবং রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়। ২ মার্চ জার পদত্যাগ করেন। দুমার সাময়িক কমিটি সরকার গঠন করে। গ্রান্ড ডিউক মিখাইল কে রাজ মুকুট পড়িয়ে দেওয়া হয়। পরেরদিন তিনিও পদত্যাগ করেন এবং জারতন্ত্রের পতন হল। রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারী মাসে বূর্জোয়া বিপ্লব সফল হল। কেরেনেস্কী সরকার ক্ষমতা গ্রহন করে।

লেনিন রাশিয়ার বিপ্লবের পূর্বে অধিকাংশ সময়ই দেশের বাইরে ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে লেনিন জার্মনী থেকে নিরপক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডে চলে যান। বিপ্লব চলাকালীন সময় লেনিন সুইজার ল্যান্ড থেকে রাশিয়ায় আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে জার্মানী হয়ে আসা -টা সহজ ছিল না। ৩ এপ্রিল ১৯১৭ লেনিন ফিনল্যান্ডের মধ্যদিয়ে রেলপথে পেট্রোগ্রাডে আসেন। পরদিনই তিনি যুদ্ধে পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে যে থিসিস রচনা করেন তা “এপ্রিল থিসিস” নামে খ্যাত। এপ্রিল থিসিসের অনেক গুলো বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত হল “বিপ্লবের প্রথম স্তরে সর্বহারা শ্রেনীর শ্রেনী চেতনা ও সংগঠন যথেষ্ঠ না থাকায় ক্ষমতায় অধিষ্টিত হল বূর্জোয়া শ্রেনী। বিপ্লবের দ্বিতীয় স্তরে সেই ক্ষমতায় নিশ্চিত ভাবে অধিষ্ঠিত হবে সর্বহারা শ্রেনী ও কৃষক সমাজের দরিদ্রতম অংশ গুলো। রুশ দেশে বর্তমান পরিস্থিতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্র হল এই যে এটা বিপ্লবের প্রথম স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে উত্তরনের প্রতীক”। অর্থাৎ বিপ্লবকে মাঝ পথে না থামিয়ে সামাজ তান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য ডাক দিলেন। এ জন্য তিনি বূর্জোয়া সাময়িক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন এবং সোভিয়েতের হাতে সকল ক্ষমতা তুলে দেবার দাবী জানালেন। আমরা পার্লামেন্ট মার্কা প্রজাতন্ত্র চাইনা। সারা দেশে সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত শ্রমিক কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের প্রতিনিধি নিয়ে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র চাই। সকল জমি জাতীয় করন করতে হবে। সামাজিক উৎপাদন ও বন্টন বিষয়ে সোভিয়েতের কতৃত্ব কায়েম করতে হবে।
তখন রাশিয়ায় জার সরকারের পতনের পরে গঠিত সাময়িক সরকারের পাশাপাশি আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র গঠিত হয়েছিল, তা হল সোভিয়েত । ১৯০৫ সালে প্রথম বূর্জোয়া বিপ্লবের সময় সোভিয়েত গুলো গঠিত হয়েছিল। এবারে ১৯১৭ সালে ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের সময়ও ব্যাপক ভাবে শ্রমিক – কৃষক ও সৈনিকের সোভিয়েতের অভ্যুদ্বয় ঘটে। সোভিয়েত ছিল শ্রমিক-কৃষক এবং সৈনিকদের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত সংগ্রাম পরিষদ ধরনের সংস্থা যারা সশস্ত্র এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে জারের পতনের পর এই সোভিয়েত গুলো কেন্দ্রিয় সংস্থা গঠন করে তারা নিজেরাই ক্ষমতা নিতে পারতেন কিন্তু নেয়নি। ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল বূর্জোয়াদের হাতে, সাময়িক সরকারের হাতে। কারন তখনো পর্যন্ত সোভিয়েত গুলোতে মেনশেভিক ও স্যোসাল রেভ্যুলশনারীদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল। এক দিকে অস্থায়ী সরকার যা ছিল বূর্জোয়া একনাকত্বের প্রতিনিধি। অন্যদিকে শ্রমিক কৃষকদের সোভিয়েত যা ছিল সর্বহারা এক নায়কত্বের প্রতিনিধি।
১৯১৭ সালের ২৬ জুলাই থেকে ৩ আগষ্ট পর্যন্ত “রুশ স্যোসাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি”-র ৬ষ্ঠ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় রাশিয়ায় আধা প্রকাশ্য ভাবে। কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে তা ঘোষনা দেওয়া হলেও স্থান জানানো হয়নি। লেনিন এই কংগ্রেসে উপস্থিত হতে পারেনি। স্টালিন এই কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এখন রাজনৈতিক করনীয় হচ্ছে সাময়িক সরকারকে উচ্ছেৎ করা। সর্বহারা শ্রেনী, দরিদ্র কৃষকদের সঙ্গে মৈত্রীবদ্ধ হয়ে বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করতে পারে। পার্টি শসস্ত্র অভ্যুত্থানের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

১৯১৭ সালের ১০ অক্টোবর “রুশ স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি” কেন্দ্রিয় কমিটির এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কয়েক দিনের মধ্যেই সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু করতে হবে। কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ ইহার বিরুদ্ধে ভোট দেন। ট্রটস্কী বলেন দ্বিতীয় সেভিয়েত কংগ্রেস বসার আগে যেন অভ্যুত্থান না করা হয় । কিন্তু সোভিয়েত কংগ্রেসের অনুমতি নিয়ে অভ্যুত্থান করতে গেলে তা জানা জানি হয়ে যাবে। তাতে সাময়িক সরকারকে সাবধান হবার এবং পাল্টা প্রস্তুতি নেবার সুযোগ দেওয়া হবে।

কেন্দ্রিয় কমিটির নির্দেশে ১৬ অক্টোবর স্টালিনের নেতৃত্বে একটি সামরিক কমিটি গঠন করা হয়। কামেনেভ-জিনোভিয়েভ-রা এ তথ্য ফাঁস করে দেয়। মেনশেভিকদের পত্রিকায় উহা ছাপা হয়। এই বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য লেনিন তাদেরকে পার্টি থেকে বহিস্কারের প্রস্তাব দেন। কিন্তু পার্টি বৈঠকে উহা গৃহিত হয়নি।

কেরেনেস্কী সাময়িক সরকার বলশেভিকদের অভ্যুত্থানের পাল্টা প্রস্ততি নেয়। ইতি মধ্যে ঘটে আর এক ঘটনা। চরম প্রতিক্রিয়াশীল কার্নিলভ বিপুল সংখ্যক বিপ্লব বিরোধী বর্বর চরিত্রের সেনা সমাবেশ করে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হয়। কার্নিলভের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী শক্তি ও সোভিয়েতকে ধ্বংশ করা। একেই সাথে সাময়িক সরকারকে অপসারিত করে ক্ষমতা দখল করা। সাময়িক কেরেনেস্কী সরকারের পক্ষে এককভাবে কার্নিলভকে ঠেকানো সম্ভব ছিল না। তাই কেরেনেস্কী বলশেভিকদের সাহায্য কামনা করলো। বলশেভিকরা কার্নিলভকে প্রতিহত করে। কার্নিলভ ও তার সহযোগীরা গ্রেফতার হল। কার্নিলাভকে পরাস্ত্র করার পর পেট্টোগ্রাদ ও মস্কোয় সোভিয়েত নেতৃত্বে পরিনত হল। সোভিয়েত গুলোতেও বলশেভিকদের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেল।

মেনশেভিকরাও “স্যোসাল রেভ্যুলেশনারী”-র জায়গা দখল করে নেয়। এ দিকে মেনশেভিক ও “স্যোসাল রেভ্যুলেশনারী” দের মধ্যে ভাঙ্গন দেখা দেয়। বামপন্থী “স্যোসাল রেভ্যুলেশনারী” নামে একটি নূতন দল গড়ে ওঠে। তারা এবং মেনশেভিকদের একটি বাম অংশ বলশেভিকদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

কেরেনেস্কী সরকারকে বলশেভিকরা ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বললো। সরকারী সেনাপতিরাও বলশেভিকদের উপর হিংস্র আক্রমন চালালো। বলশেভিকদের পত্রিকা প্রাভদার অফিস তছনছ করে দিল। প্রাভদা বন্ধ হয়ে গেল । বহু বলশেভিক গ্রেফতার হল। লেনিনের উপর হুলিয়া জারী হল। লেনিন আবার আত্মগোপনে গেলেন। বিপ্লবী রেড গার্ডদের অস্ত্র কেড়ে নিতে আরম্ভ করলো। সাময়িক সরকার এখন রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিনত হল। কার্নিলভ ও তার সহযোগিদের জেলখানা থেকে ছেড়ে দিল। কেরেনেস্কী সরকার বলশেভিকদের অভ্যুত্থানের পাল্টা প্রস্তুতি নেয়। পেট্রোগ্রাদ ও মাস্কোতে সৈন্য সমাবেশ করে। ২৪ শে অক্টোবর সকালে কেরেনেস্কী প্রথম বলশেভিদের উপর সরাসরি আক্রমন করে। বলশেভিকরা তা প্রতিহত করে। সকাল ১১ টায় কেরেনেস্কী সাময়িক সরকার উচ্ছেসের আহব্বান জানিয়ে বলশেভিক মুখপাত্র প্রকাশিত হল। রাতে লেনিন গোপন অবস্থা থেকে প্রকাশ্য হয়ে বলশেভিকদের ঘাটি স্মোলনিতে উপস্থিত হলেন। এই স্থান পাহাড়া দিচ্ছে শসস্ত্র বলশেভিকরা। ২৫ অক্টোবর ১৯১৭ বিপ্লবী সৈনিক, নাবিক ও সশস্ত্র রেডগার্ড কেরেনেস্কী সরকারের শীত প্রসাদ দখল করে। কেরেনস্কী সরকারের মন্ত্রী সভার সদষ্যদের গ্রেফতার করা হল। কেরেনেস্কী পালিয়ে যেতে সক্ষম হল। বিনা রক্তপাতে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতায় আরোহন করে। রাজধানী সেন্ট পিটাসবুর্গের স্মোলি নামক এক প্রসাদে এ দিনই রাত ১০:৪৫ মি. দ্বিতীয় নিখিল রুশ কংগ্রেস উদ্ভোধন করলেন লেনিন। কংগ্রেসে নূতন সরকারের ঘোষনা করা হল “পিপলস কমিশারদের কাউন্সিল”। যার সভাপতি হলেন লেনিন। ইহার মধ্যে বলশেভিক বাদে অন্য কেউ ছিল না। পৃর্থিবীর ইতিহাসে নূতন একটি শোষনহীন সামাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল। বিশ্ব ইতিহাসে ইহা হল অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।

যুদ্ধের পরে পুরাতন জারের সৈন্য বাহিনীর বদলে “লাল ফৌজ” গঠন করা হয়। ক্ষমতা চ্যূত বূর্জোয়া ও জমিদাররা শতগুন হিংস্রতা নিয়ে গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাস শুরু করে। বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষঢ়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মেনশেভিক ও স্যোসাল রেভ্যুলশনারীরাও একেই সাথে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ফলে বলশেভিকদের জার্মানীর সাথে সন্ধি করতে হয়। কারন যুদ্ধে জার্মানরা রাশিয়ার অনেক অঞ্চল দখল করে নেয়। বুখারিন ও ট্রটস্কী এই সন্ধির বিরোধীতা করে। ক্ষমতা চ্যুত শ্বেত বাহিনীর সাথে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।সাম্রারাজ্যবাদী ব্রিটেন, ফ্রান্স জাপান সহ ১৪ টি পুজিবাদী রাষ্ট্র এই যুদ্ধে পরাজিত জারের শ্বেত বাহিনীকে ইন্দন দেয়। বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা অর্জিত হলেও এই প্রতিবিপ্লবকে প্রতিহত করতে যে রক্তপাত হয়েছে তা মোটেও কম নয়। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ এই তিন বছর যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে ১০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়। যুদ্ধের কারনে দুর্ভিক্ষে মারা যায় ৭০ লক্ষ, মহামারীতে মারা যায় আরও ৩০ লক্ষ।
১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে বূর্জোয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বলশেভিকরা বিজয়ী হলো স্যোসাল ডেমোক্রাট মেনশেভিকদের বিশ^াস ঘাতকতা সফল হয়নি। বলশেভিকরা “এপ্রিল থিসিস” বাস্তবায়ন শুরু করেন। দেশের বড় বড় শিল্প কারখানা জাতীয় করন করা হল। সোভিয়েত সরকার জারের আমলের সকল বৈদেশিক ঋৃন বাজেয়াপ্ত করে। জাতীগত ও ধর্মীয় বৈষম্য মূলক আইন ও প্রথা বাতিল করা হয়। জমিদারের জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নারী পুরুষের সমানধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। নারীর ভোটাধিকার দেওয়া হয়। তখনও পৃথিবীর অন্যকোনো বূর্জোয়া দেশে নারীর ভোটাধিকর ছিল না। অক্টোবর বিপ্লবের ৩ বছর পর ১৯২০ সালে ইংল্যান্ডে নারীর ভোটাধিকার প্রদান করা হয়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক পর্যন্তও গনতান্ত্রিক য্ক্তুরাষ্ট্রে নিগ্রোদের নাগরিক অধিকার ছিল না। মার্কিন কৃষনাঙ্গদের ভোটাধিকার ছিল না ও সম্পদহীন মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। খাদ্য শষ্যের ব্যবসা রাষ্ট্রয়াত্ব করা হল। খাদ্য শস্যের ব্যক্তিগত ব্যাবসা নিষিদ্ধ করা হল। কৃষকের হাতে যা উদ্ধৃত্ত খাদ্যশস্য থাকবে রাষ্ট্র নির্দিষ্ট দামে তা কিনে নিবে। সার্বজনীন শ্রম ব্যবস্থা চালু করা হয়। সেই সাথে যে সকল সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রথা চালু ছিল তা বাতিল করা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করা হয়। এক ধাক্কায় সোভিয়েত সামাজে যে গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উন্নীত করা হয়েছিল তা আর বিশ্বের কোথায়ও দেখা যায় নি।

মার্কসবাদীরা জতিতে জাতিতে যুদ্ধ সমর্থন করেনা বরং বিরোধীতা করে। কিন্তু যুদ্ধ লেগে গেলে আর একটি যুদ্ধ ছাড়া উহা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় নেই। তাই পার্থক্য করতে হবে ন্যায় যুদ্ধ আর অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যচারীতদের যুদ্ধকে ন্যায় যুদ্ধ বলা হয়। সেটা আত্মরক্ষা মূলক যুদ্ধ। পিতৃভুমি রক্ষার দাবী তখনই উঠতে পারে যখন কোনো জাতী সত্যিই স্বধীনতার জন্য যুদ্ধ করে। লেনিন ইহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। মার্কসবাদীরা যুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীন শ্রেনী সংগ্রামের বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখে। প্রত্যেকটি যুদ্ধকে পৃথক পৃথক ভাবে বিচার করতে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসরন করেন। যতদিন শ্রেনী বিভক্ত সমাজ থাকবে ততোদিন যুদ্ধ থাকবে। একমাত্র দুনিয়া জোড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পরেই যুদ্ধের অবসান হতে পারে। শোষকদের নিজেদের মধ্যকার যুদ্ধ এবং শোষক ও শোষিতের মধ্যকার যুদ্ধ। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারা পিতৃ ভূমি রক্ষার তুলনায় সাম্রারাজ্যবাদী চক্রান্তের শিকারে পরিনত হয়। তারা মেনশের্ভিকদের সহযোগীতা করে। সমস্ত উরোপের স্যোসাল ডেমোক্রেটরা এই সুবিধাবদী পন্থা গ্রহন করে। ইউরোপে বিপ্লব তাই পরাজিত হয়। লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক পার্টি ইহার রিরোধীতা করে সংগ্রামে সাফল্য অর্জন করে। তখন থেকে স্যোসাল ডেমোক্রেটিকদের বলতে সুবিধাবাদী সংস্কারবাদী দলকেই বুঝায়। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতাদের সাম্রারজ্যবাদী যুদ্ধ নীতি মূল্যায়ন সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পতন হয়। ১৯১৯ সালে লেনিনের নেতৃত্বে বিশ্বের সমজবাদীদের নিয়ে তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠন করা যায়। সংক্ষেপে ইহার নাম “কমিনটার্ন” রাখা হয়। স্যোসাল ডেমোক্রেটিক নাম ব্যবহারীকারী সুবিধাবাদীদের থেকে আলাদা করার জন্য লেনিন এই সম্মেলনে ঘোষনা করেন, এখন থেকে পার্টির নাম হবে “কমিউনিস্ট পাটির্”। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে সাম্রারজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহ যুদ্ধে পরিনত করে রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেনীর ন্যায় যুদ্ধের সাফল্যই অক্টোবর বিপ্লব।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কংগ্রেস সমূহ:-

১. প্রথম কংগ্রেস প্যারিস-ফ্রান্স ১৮৮৯
২. দ্বিতীয় কংগ্রেস ব্রাসেলস-জার্মান ১৮৯১
৩. তৃতীয় কংগ্রেস জুরিখ-সুইজারল্যান্ড ১৮৯৩
৪. চতুর্থ কংগ্রেস লন্ডন-ব্রিটেন ১৮৯৬
৫. পঞ্চম কংগ্রেস প্যারিস- ফ্রান্স ১৯০০
৬. ষষ্ঠ কংগ্রেস আমস্টারডাম-সুইজারল্যান্ড ১৯০৪
৭. সপ্তম কংগ্রেস স্টুট গার্ড-জার্মান ১৯০৭
৮. অষ্টম কংগ্রেস কোপেন হেগে- সুইডেন ১৯১০
৯. নবম কংগ্রেস ব্রাসেলস-জার্মান ১৯১২

ওয়ারেজ আহমেদ *ঢাকা * ২৫ অক্টোবর ২০১৭* মোবাইল :- ০১৭৫১৬৪৫৫৪০।

Developed by: