সর্বশেষ সংবাদ
মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পায়নি কিশোর  » «   সিলেটে ৫৭৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, থাকছে তিনস্তরের নিরাপত্তা  » «   জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ জনের নাম প্রকাশ  » «   মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সু চি-সেনাপ্রধান  » «   শাবির ভর্তি পরীক্ষা ১৮ নভেম্বর  » «   তিন ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা, তবু ভিক্ষা করেন মা!  » «   চালের দামের লাগাম টানতে নিষেধাজ্ঞা উঠল প্লাস্টিকের বস্তা থেকে  » «   লিজে আনা বোয়িং ফেরতের উপায় খুঁজছে বিমান  » «   লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ ‘সন্ত্রাসী হামলা’, আহত ১৮  » «   মহানগর কমিটির সভা: এসডিসির সদস্য আব্দুস শুকুর স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত  » «   মিরতিংগা চা বাগানে মস্তকবিহিন লাশ উদ্ধার, আটক ২  » «   অভিনয় ছাড়ছেন মিশা সওদাগর  » «   লাউয়াছড়ায় গলায় ছুরি ধরে ট্রেনের দুই যাত্রীর টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই  » «   মিয়ানমারে সাইবার হামলা চালিয়েছে বাংলাদেশি হ্যাকার গ্রুপ  » «   রাখাইনে সহিংসতায় দায়ী পাকিস্তান ও আইএসআই  » «  

দায় কি শুধুই বাংলাদেশের?



notd7ফরিদুল আলম: সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যেভাবে রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চলছে, এটাকে স্মরণকালের বিশ্ব ইতিহাসে জঘন্যতম ও ঘৃণ্যতম নির্যাতনগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। ভিটামাটি, সহায়-সম্বলহীন এসব মানুষ বাঁচার আকুতি নিয়ে যথারীতি ছুটে আসছে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের বীভৎস লাশের ছবি দেখে গা শিউরে ওঠে। বাংলাদেশ সরকার বরাবরের মতো মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়ে তাদের আশ্রয় প্রদান করেছে এবং এখন পর্যন্ত প্রতিদিন আসতে থাকা মানুষগুলোকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশসহ সাড়া পৃথিবীর গণমাধ্যমগুলো এই বর্বরোচিত ঘটনার নিন্দা অব্যাহত রাখলেও মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গা নিধন তত্পরতা চলছে আপন গতিতে। এবারই প্রথম নয়, এর আগে গত বছর একইভাবে নিরাপত্তা চৌকিতে রোহিঙ্গাদের হামলার জের ধরে সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে সেবার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ৮০ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা, যারা এখনো কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। এর আগে ২০১২ সালে রাখাইনে বৌদ্ধদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংঘর্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। তারও আগে ১৯৯১ সালে প্রায় দুই লাখ ৫৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে কিংবা নির্যাতনের ভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করলে ১৯৯৬ সাল নাগাদ বিভিন্ন দফায় দুই লাখ ৩০ হাজার সে দেশে ফেরত গিয়ে শরণার্থী মর্যাদা হারালেও পরে বিভিন্ন সময়ে তাদের অনেকেই আবারও ফিরে আসে এবং অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বাংলাদেশে বসবাস করতে থাকে। এর বাইরে কক্সবাজারে দুটি শরণার্থী শিবির কুতুপালং ও নয়াপাড়ায় রয়েছে ৩৬ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসবাস। সুতরাং ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ধারণা করা যায়, ছয় লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে আছে। বাংলাদেশ শরণার্থী-সংক্রান্ত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র না হওয়া সত্ত্বেও শুধু জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের ১৪ অনুচ্ছেদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ভীতির শিকার হয়ে আসা এসব মানুষকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে আশ্রয় দিয়েছে।
এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সমঝোতা এক অর্থে ১৯৯৬ সালের পর আর অগ্রসর না হওয়ায় বাংলাদেশ নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যাপারে ওই সময়ের পর থেকে আর আগ্রহ প্রদর্শন না করলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা এসব সংখ্যালঘুর প্রতি কখনো অমানবিক আচরণ প্রদর্শন করেনি। সরকারি সিদ্ধান্তেই কক্সবাজারের লেদা নামক স্থানে বড় একটি অংশের রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া ছাড়াও গত বছর থেকে হাতিয়ার ঠেঙ্গারচরে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো আসতে থাকাদের সরকারিভাবে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া ছাড়াও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এসব নির্যাতিত মানুষের প্রতি সদয় আচরণ করার জন্য। আমরা নিঃসন্দেহে মানবিক আচরণই প্রত্যাশা করি এবং সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচকভাবে না দেখার কোনো কারণ দেখি না। কিন্তু আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা যে আমাদের মানবিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ কি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিধনকার্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায় মোচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে যা জানা যায় তা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত কমবেশি এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী এবারের সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে তিন লাখেরও অধিক রোহিঙ্গার প্রবেশ ঘটতে পারে। অথচ অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কিংবা এর প্রভাবশালী (স্থায়ী সদস্য) রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংখ্যালঘু নিধনের বিরুদ্ধে কোনো তত্পরতা দৃশ্যমান হয়নি। উপরন্তু গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সফরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদায় আসীন রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চিকে এভাবে আশ্বস্ত করতে দেখা গেল যে নিরাপত্তার স্বার্থে মিয়ানমারের যেকোনো পদক্ষেপকে ভারত সমর্থন দেবে। অর্থাৎ সহজ হিসাবে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, মিয়ানমার যা করছে তা যেন তারা অব্যাহত রাখে। ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ করলে এ-ও দাঁড়ায়, বাংলাদেশ এসব মানুষকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছে তা ভুল করেছে এবং তাদের এ দেশে আশ্রয় না দিয়ে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর বন্দুকের নলের কাছে সমর্পণ করা উচিত ছিল। শুধু ব্যতিক্রম দেখা গেল তুরস্কের ক্ষেত্রে। অবশ্য এর একমাত্র কারণ রোহিঙ্গারা মুসলিম জনগোষ্ঠী। গত ৭ সেপ্টেম্বর সে দেশের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পত্নী ঢাকা পৌঁছেই সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমাদের দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবির ও পার্শ্ববর্তী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে আসছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার দেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে জানান। ব্যস, আপাতত এ পর্যন্তই। আমরা জানি, তুরস্ক যদি বিষয়টি উত্থাপনও করে, তবে এর ফলাফল কী হবে। সংগত কারণে বাংলাদেশ এর ভুক্তভোগী হওয়ায় এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মনোযোগ প্রত্যাশা করলেও পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের ওপর। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন-মিয়ানমার মৈত্রীর সম্পর্কের কারণে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া সম্ভব হবে না। বড়জোর একটি তহবিল তৈরি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্পরতা বাড়বে তাদের প্রতি মানবিক সহায়তা প্রদানের নামে, যেমনটা এরই মধ্যে চলছে ১৯৯১ সাল থেকে। অর্থাৎ আবারও নতুন করে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া অথচ তাদের ফেরত পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চিত।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের ভূমিকার বিষয়ে। বাংলাদেশ এসব বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দিয়ে কি ভুল করেছে, এমন প্রশ্ন উঠেছে বারবার। তবে এখানে আমাদের অবস্থাটা হয়ে গেছে অনেকটা এমন যে রাখাইন রাজ্যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তার দায় নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা। আমাদের অবশ্যই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ঝালাই করার সময় এসেছে এখন। এখানে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো আঞ্চলিক ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে আমরা বন্ধুদের সহায়তা কতটা পাব, তা ভাবতে হবে। অনেকে মত প্রকাশ করেছেন যে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে বাংলাদেশকে তত্পর হতে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই মুহূর্তে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে বাংলাদেশ সক্ষম কি না। বিদ্যমান বাস্তবতায় আমরা হয়তো মুসলিম বিশ্বের সমর্থন প্রত্যাশা করতে পারি; কিন্তু তা অর্জন করাটা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় কতটুকু সম্ভব সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং যা দাঁড়াচ্ছে তা হচ্ছে এই নিধনযজ্ঞ বন্ধে শুধু মিয়ানমার সরকারের আন্তরিক ইচ্ছাই একমাত্র কাম্য। এ জন্য মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করতে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে হবে। এদিকে যারা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আইনগত প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্রতি সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো নাগরিকের দায়ভার তারা নেবে না। আমরা জানি, রোহিঙ্গারা সে দেশে রাষ্ট্রীয় পরিচয়বিহীন অস্থায়ী নাগরিক। সুতরাং যারা বাংলাদেশে এসেছে, তাদের পক্ষে কোনো বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা সম্ভব না। এ কথার অর্থ এখানে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো, তাদের আর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। তাহলে তো প্রশ্ন থেকেই যাবে, শুধু মানবিক আচরণ প্রদর্শনের নামে এ দায় কি শুধুই বাংলাদেশের?
বেইজিং, চীন থেকে
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
mfulka@yahoo.com

Developed by: