সর্বশেষ সংবাদ
মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পায়নি কিশোর  » «   সিলেটে ৫৭৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, থাকছে তিনস্তরের নিরাপত্তা  » «   জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ জনের নাম প্রকাশ  » «   মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সু চি-সেনাপ্রধান  » «   শাবির ভর্তি পরীক্ষা ১৮ নভেম্বর  » «   তিন ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা, তবু ভিক্ষা করেন মা!  » «   চালের দামের লাগাম টানতে নিষেধাজ্ঞা উঠল প্লাস্টিকের বস্তা থেকে  » «   লিজে আনা বোয়িং ফেরতের উপায় খুঁজছে বিমান  » «   লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ ‘সন্ত্রাসী হামলা’, আহত ১৮  » «   মহানগর কমিটির সভা: এসডিসির সদস্য আব্দুস শুকুর স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত  » «   মিরতিংগা চা বাগানে মস্তকবিহিন লাশ উদ্ধার, আটক ২  » «   অভিনয় ছাড়ছেন মিশা সওদাগর  » «   লাউয়াছড়ায় গলায় ছুরি ধরে ট্রেনের দুই যাত্রীর টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই  » «   মিয়ানমারে সাইবার হামলা চালিয়েছে বাংলাদেশি হ্যাকার গ্রুপ  » «   রাখাইনে সহিংসতায় দায়ী পাকিস্তান ও আইএসআই  » «  

ধর্ষণজনিত অপরাধের দ্রুত বিচার প্রয়োজন



hutআহমদ রফিক:বাংলাদেশি সমাজে সব ধরনের নারী নির্যাতন (‘ধর্ষণ’ শব্দটি যদি ব্যবহার না-ই করি) আতঙ্কজনক হারে বাড়ছে। বাড়ছে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায়। ত্রিধাবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশ এদিক থেকে সবার সেরা, হয়তো আফ্রিকার কোনো কোনো দেশ বাদে।
আমরা বাংলাদেশের কথাই বলছি। বলছি নিজ দেশের চরম সামাজিক অবক্ষয় ও যন্ত্রণার কথা। বিশেষ করে নারী নিগ্রহ প্রসঙ্গে। এ বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদী লেখাও কম নয়, তবু যথাপূর্বম তথাপরম। বাংলাদেশি সমাজ, নাগরিক সুধীসমাজ, এমনকি প্রশাসনও বোধ হয় মেনে নিয়েছে বীভৎস সব ঘটনা। নানা কায়দায়, নানা ফিকিরে চলছে নারীদের ওপর হামলা। গৃহবধূ থেকে তরুণী-কিশোরী, এমনকি শিশুকন্যাও বাদ যাচ্ছে না এই হামলা থেকে।
এই তো কয় দিন আগে, দৈনিক পত্রিকার খবরে প্রকাশ, পর পর কয়েকটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন।
এসব খবর বিস্তারিত পড়া খুবই যন্ত্রণাদায়ক। শিরোনাম পড়েই হৃদয়ের যন্ত্রণা শুরু। ভাবনা, এ দেশের পুরুষ সমাজের দুর্বৃত্তরা কতটা অমানুষ হলে একটি শিশুকন্যার ওপর যৌন নির্যাতন চালানোর প্রবৃত্তি হতে পারে।
পাশাপাশি ব্যাপক হারে চলছে কিশোরী ও তরুণীদের ওপর পরিকল্পিত ছককাটা হামলা। যেমন বখাটে ধনীর দুলাল, তেমনি বিভিন্ন পেশার পুরুষ। কখনো বিলাসী আমোদের লোভ দেখিয়ে, কখনো বিয়ের কথা বলে, কখনো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে, কখনো জবরদস্তিতে চলছে এসব যৌন হামলা। বলিহারি দু-চারজন আমোদপ্রত্যাশী ছাত্রী বা অনুরূপ কারোর যে তারা সহজেই প্রতারণার শিকার। বিএমডাব্লিউ বা অনুরূপ বিলাসবহুল দুর্মূল্য গাড়িতে চড়ে ‘লং ড্রাইভে’ যাওয়া বা রেস্তোরাঁয় দামি ভোজনের হাতছানি উপেক্ষা করা যায় না। এটা প্রত্যাশিত নয়।

তবু বলতে হয়, কারণ বা উপলক্ষ যাই হোক, বিভ্রান্ত দুর্বৃত্ত তরুণদের এসব অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য, চরম শাস্তির যোগ্য। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন স্বদেশি সমাজের এমন দূষিত পরিণতির কথা। কিভাবে সম্ভব হয়েছে এ অবিশ্বাস্য পরিণাম! রাজনৈতিক শাসন ও প্রশাসনই বা কেমন করে এত ঘটনার পর ঘটনা নিয়ে অবিচলিত থাকতে পারে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে?
দুই.
বাস্তব ক্ষেত্রে ঘটনার ভয়াবহতা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সভ্য রাষ্ট্রীয় শাসন মাত্রেরই তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার কথা। প্রয়োজনে অবস্থা আয়ত্তে আনতে নতুন আইন প্রণয়ন ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা চালু করে অবস্থা নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সুবিচারের পূর্বশর্ত হচ্ছে যথাযথ, নিরপেক্ষ পুলিশি তদন্ত ও সঠিক অভিযোগপত্র দাখিল, ফরেনসিক রিপোর্টে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সততা এবং ভয়ভীতি-চাপ উপেক্ষা করে নৈতিকতা বজায় রাখা।
সর্বোপরি বহুকথিত আপ্তবাক্য ‘রাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে’ সর্বোচ্চ সততার সঙ্গে কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন। যেমন তদন্তকারী পুলিশের পক্ষে তেমনি আলামত শনাক্তকরণের প্রতিবেদন তৈরিতে কর্তব্যরত চিকিৎসকের পক্ষে। তা না হলে সুবিচার অসম্ভব। আর সুবিচার না হলে সমাজে অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। বাড়ে অপরাধের ঘটনা প্রতিটি ক্ষেত্রে। হোক তা খুন, অপহরণ, প্রতারণা বা যৌন নির্যাতন।

আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো যে স্বাধীন বাংলাদেশি সমাজের শিক্ষিত শ্রেণিতে, মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান শ্রেণির তরুণ ও যুবাদের মধ্যে ইদানীং মাদক গ্রহণ ও যৌন অনাচারের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। অপরাধ ঢাকতে বা চাপা দিতে বা আইনি শিকেয় ঝুলিয়ে রাখতে ব্যবহার করা হয় বিত্তের প্রভাব, সামাজিক প্রভাব, রাজনৈতিক ও অনুরূপ প্রভাব। নির্যাতিত যদি বিত্তবান না হয় তাহলে তো কথাই নেই। তার নিগ্রহ প্রায় ক্ষেত্রেই বিচারের আওতায় পৌঁছে না। সুবিচার তো দূরের কথা।

তাই উল্লিখিত অপরাধগুলো বিপজ্জনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। গ্রামাঞ্চলে বা ছোটখাটো শহরে এসব অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া হয় অর্থের জোরে, সমাজপতিদের কল্যাণে। সালিসের নামে অবিচার এবং তা জোটে নির্যাতিতারই কপালে। পুরুষের দোষ ঢাকা পড়ে যায় পুরুষশাসিত সমাজের অন্যায়-অবিচারে। গ্রাম্য বিচারে প্রায়ই সব দোষ নির্যাতিত নারীর বা তরুণীর।

বাংলাদেশি সমাজ এমন স্তরে পৌঁছে গেছে। অন্যায়ই ন্যায়, অবিচার সেখানে বিচার। আদর্শ, নৈতিকতা ইত্যাদি তাদের শক্তিমান অবস্থান বজায় রাখতে না পেরে নির্বাসনে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এমনটি মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু সুশাসনের অভাবে এমনটিই বাস্তব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। প্রতিবাদও ব্যতিক্রম বাদে ততটা জোরালো নয়। আন্দোলন তো প্রায় অনুপস্থিত।
তিন.
অবস্থার সামাজিক ভয়াবহতা বুঝতে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলো ওল্টালেই যথেষ্ট। বিস্তর প্রমাণ তাতে ধরা রয়েছে। আরো একটি তথ্য মনে রাখার মতো যে যৌন নির্যাতনের যত ঘটনা ঘটছে শহরে-গ্রামাঞ্চলে, তার সামান্যই সংবাদপত্র অবধি পৌঁছে। শেষোক্ত ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরো কম। তাই নারী নির্যাতনের সব ঘটনা আমাদের গোচরে আসে না। হয়তো বা জলে ভাসমান বরফখণ্ডের ওপর অংশই দেখি।
তবু সংবাদপত্রের পাতায় যা পড়ি, তা-ও সমাজের অশুভ চরিত্র ও অপরাধপ্রবণতা ও বাস্তবতা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট। এটা কোনো সুস্থ সমাজের প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। ঘটনার বাস্তবতা বুঝতে বিগত কয়েক দিন ও সপ্তাহের একাধিক দৈনিক পত্র সংরক্ষণে যে ছবি উঠে এসেছে তা সুস্থ সমাজ-বিচারে ভয়াবহই বলতে হয়। কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, এ জাতীয় ঘটনা বিশ্বের সব দেশেই ঘটে থাকে। না, আমি এ কথা মানি না। কিছু ঘটনা ঠিকই ঘটে। কিন্তু নিয়মিত এত সংখ্যায় ঘটে না। যে দু-চারটি দেশে ঘটে তাদের সমাজ নিঃসন্দেহে অপরাধী। বাংলাদেশ সেগুলোর মধ্যে একটি। বিশেষ বিচারে একটি।
আপনি যদি ক্রমান্বয়ে এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ কিংবা এক মাসের দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টে যান, তাহলে দেখা যাবে, এমন একটি দিনও নেই যেদিন নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। সংরক্ষিত কাগজগুলোর দু-এক দিনের পাতায় তেমন প্রমাণ মিলবে। এক মাস আগের একটি দৈনিকের তৃতীয় পৃষ্ঠায় তিন কলামের শিরোনাম : ‘তিন জেলায় তিন শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ’। এ খবরই বিশেষ বাক্সবন্দি করে শিরোনাম : ‘যশোরে প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ’, ‘সিরাজগঞ্জে ধর্ষণ পাঁচ বছরের শিশুকে’, ‘শাহরাস্তিতে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার’।
এ ঘটনাগুলোর বিশদ বিবরণে না গিয়েও বলতে হচ্ছে, বেশ কিছুদিন থেকে শিক্ষকতার মতো পবিত্র ব্রতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে যৌন অনাচারের ক্রমবর্ধমান ঘটনা আমাদের অবাক করে দিচ্ছে। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ? ভাবা যায় না। কিন্তু ঘটছে। এর আবার একটি গোপন দিকও আছে, যা নানা বাস্তব কারণে প্রকাশ পায় না। লোকলজ্জা, সামাজিক সমস্যা, ব্যক্তিজীবনের সমস্যা। তাই যৌনক্ষুধায় তাড়িত শিক্ষকের অপরাধ পর্দার অন্তরালে থেকে যায়। বিচার ও শাস্তি তো দূরের কথা।
পূর্বোক্ত তারিখের ওই কাগজেরই ১৬ পৃষ্ঠায় আরেকটি খবরের শিরোনাম : ‘যশোরে অন্তঃসত্ত্বা তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ’। খবরের শুরুতে বলা হয়েছে : ‘যশোরের অভয়নগর থানা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণীকে (২১) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ’ তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। একে তো অন্তঃসত্ত্বা তরুণী, তা-ও পাঁচজনের গণধর্ষণ। তরুণীটির (শারীরিক-মানসিক) অবস্থার কথা ভেবে দেখুন তো। সমাজে বর্বরতার ঝোঁক কোথায় গিয়ে পৌঁছালে এমন দুর্বৃত্তপনা সম্ভব!
একই দিনের আরেকটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম : ‘বাঘায় ছাত্রী, চাঁদপুরে শিশু ও গাইবান্ধায় কিশোরীকে ধর্ষণ’। এ ঘটনার সামান্য বিবরণ : ‘রাজশাহীর বাঘায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে তুলে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করেছে দুই বখাটে। পরে রাত ৩টায় তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে পলাতক দুই বখাটে তরুণ। এ ছাত্রীর তাত্ক্ষণিক যন্ত্রণার কথাই ভাবা হয়ে থাকবে, তার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা নয়। ধর্ষিত তরুণী, ছাত্রী, গৃহবধূদের নষ্ট ভবিষ্যৎ নিয়ে সংবাদপত্র মাথা ঘামায় না, ভাবে না সুধীসমাজ বা রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা প্রশাসন। যার যন্ত্রণা সেই বোঝে।
আর চাঁদপুরের এক ‘মক্তবে আরবি পড়তে গিয়ে ৯ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। নির্যাতিত শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ’ বলা বাহুল্য, ধর্ষক মক্তবের শিক্ষক। এ ছাড়া গাইবান্ধায় এক প্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণচেষ্টার শিকার। বলা বাহুল্য, এ তিনটি ঘটনাই পূর্বোক্ত ধর্ষণ ঘটনা থেকে ভিন্ন, যদিও একই তারিখে ভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত। এই পত্রিকারই শেষ পৃষ্ঠায় খবরের শিরোনাম : ‘বগুড়ায় ছাত্রী ধর্ষণের প্রমাণ/নির্যাতনের আলামত জব্দ। ’
একই কাগজে ধর্ষণবিষয়ক কয়েকটি সংবাদ লক্ষ করার মতো। শিরোনাম : ‘রূপগঞ্জে বাড়িতে ঢুকে কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা’, ‘ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দুর্বৃত্তরা ওই বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে’। একই সঙ্গে আরেকটি খবর ১৯ নম্বর পাতায় : ‘ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন’। বলেছেন অনেক কথা। এ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে : ‘খুন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। … শুধু জুলাই মাসেই দেশে ৯৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন গণধর্ষণের শিকার। তাদের মধ্যে ১১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। রাজশাহীতে গেস্টহাউসে ধর্ষণের শিকার এক নারী। ’
কি বীভৎস চেহারা সমাজের! অফিসে, শিক্ষায়তনে, ট্রেনে, বাসে, এমনকি শ্রেণিকক্ষেও (সম্প্রতি এ খবরটি যথেষ্ট চাঞ্চল্য তৈরি করেছে) শিশু, কিশোরী, তরুণী, গৃহবধূ, শিক্ষিকা বা অফিসকর্মী—কেউ নিরাপদ নয় ধর্ষকের হাত থেকে। অসীম ক্ষমতাধর সমাজের ওই দুর্বৃত্তদল। প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে উল্লিখিত সম্পাদকীয়তে।

এত ঘটনার পরও ওই পত্রিকায় চাঞ্চল্যকর একটি খবর, সিঙ্গেল কলামে ‘ট্রাকে কিশোরী ধর্ষণ/চালক ও হেলপার/চার দিনের রিমান্ডে’। এ ঘটনার পরবর্তী ফলাফল কী হবে, কোথায় দাঁড়াবে জানি না। আমার বিবেচনায় এ খবরটি চোখে পড়ার মতো করে ছাপা উচিত ছিল। কারণ পত্রিকার খবর খুঁটিয়ে পড়ার মতো পাঠক ছাড়া এটি কারো চোখে না পড়ারই কথা। ভাবতে পারা যায় এক দিনের একটি কাগজে হত্যাসহ নারী ধর্ষণের এত খবর! সমাজকে কি এগুলো আদৌ বিচলিত করছে?
আবার সেই ৪ আগস্ট (২০১৭)। তৃতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠাতেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের ভাষ্যে সমাজে ক্রমবর্ধমান যৌন নির্যাতন সম্পর্কে দুই কলামের একটি শিরোনাম : ‘মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বিকৃতি/বাড়ছে ধর্ষণ’। এ বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে পর্নোগ্রাফি, কিছুসংখ্যক পুরুষের বিকৃত মানসিকতার প্রতি, ধর্ষণের কারণ হিসেবে। সেই সঙ্গে দুটি ছোট শিরোনাম : ‘দৈনিক ছয় নারী ধর্ষণের শিকার’, ‘আইনের কঠোর প্রয়োগের পরামর্শ’। এ বক্তব্যের মূল্যায়নে বলতে হয়, আমরা সত্যিই কি কোনো সভ্য দেশে বাস করছি? বাংলাদেশি সমাজ কি আদৌ সভ্য সমাজ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে?
ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলামে ছোট্ট একটি খবর ‘কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ডিমলায় তরুণীকে বেঁধে মারধরের পাঁচ দিন পর মৃত্যু। ’ এ তথ্যটি কি ছোট্ট একচিলতে খবর হওয়ার মতো গুরুত্বহীন? আমি পত্রিকা সম্পাদক ও সাংবাদিকদেরও বলতে চাই, তাঁরাও যেন তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নারী ধর্ষণ, নারীহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটান। একই কাগজে আরেকটি অনুরূপ ছোট্ট খবর : ‘গফরগাঁওয়ে দেবরের যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে ভাবির আত্মহত্যা। ’ এটা আত্মহত্যা নয়, এ মৃত্যু আইনের চোখেও হত্যার সমতুল্য। এই কাগজেই আরো একটি খবর : ‘আশুলিয়ায় নারীশ্রমিকের ধর্ষকের গ্রেপ্তার দাবি। ’
মাত্র তিনটি কাগজে একই দিনের সংখ্যায় এত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা কী বার্তা দেয় আমাদের বাংলাদেশি সমাজ সম্পর্কে? এর পরও দেখছি ওই দিনের অন্য একটি কাগজে ধর্ষণের খবর ও কড়া সম্পাদকীয়। এর পরও কি কথিত সুধীসমাজ চুপ করে থাকবে? সুস্থ চেতনার তরুণসমাজ গর্জে উঠবে না নারী নির্যাতনের বর্বরতার বিরুদ্ধে? প্রশাসন তার রুটিন কাজ চালিয়ে যাবে। আর ক্রমাগত বেড়ে চলবে নারী ধর্ষণের ঘটনা?
কত দিন? আর কত দিন চলবে এ অবস্থা? আমরা কি শুধু এসব ক্ষেত্রে বিচার-ব্যাখ্যা করে, কলাম লিখে, এখানে-সেখানে প্রবন্ধ লিখে বা বক্তৃতা দিয়ে দায় শেষ করব? নামব না রাজপথে? যাতে রাষ্ট্রযন্ত্র বাধ্য হয় নারীর প্রতি বর্বরতার অবসান ঘটাতে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণে। উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করতে পারি কিশোরী ইয়াসমীনকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিক্রিয়ায় উত্তাল প্রতিবাদের ঘটনা, যেখানে তৎকালীন বিএনপি সরকারকে পিছু হটতে হয়েছিল। এখন সময় হয়েছে রুখে দাঁড়ানোর। নারী ধর্ষণের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

Developed by: